মুরাদনগরে ক্যাপসিকাম বিপ্লব: ১৪ ইউনিয়নে ভিনদেশি সবজিতে নতুন স্বপ্ন


হাফেজ নজরুল :
মাঠের পর মাঠ সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাল, হলুদ আর সবুজ রঙের ক্যাপসিকাম। এক সময় যা ছিল কেবল বিলাসবহুল হোটেলের সালাদ কিংবা বিদেশি পদের অনুষঙ্গ, সেই ভিনদেশি সবজি এখন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার উর্বর মাটিতে দোল খাচ্ছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রথমবারের মতো এ উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে ক্যাপসিকাম চাষ, যা স্থানীয় কৃষকদের মাঝে নতুন এক অর্থনৈতিক বিপ্লবের স্বপ্ন বুনছে।

'কুমিল্লা অঞ্চলের টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প'-এর অধীনে মুরাদনগর উপজেলা কৃষি অফিস এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৪টি ইউনিয়নে একযোগে শুরু হয়েছে এই উচ্চমূল্যের ফসলের আবাদ। বিশেষ করে মুরাদনগর সদর, নবীপুর পশ্চিম, নবীপুর পূর্ব, বাংগরা পূর্ব, ধামঘর, জাহাপুর, বাবুটিপাড়া ও আকবপুর ইউনিয়নের মাঠগুলোতে এখন ক্যাপসিকামের সমারোহ। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রায় ২ হেক্টর জমিতে পলি মালচিং পেপার ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই আবাদ সম্পন্ন হয়েছে।

ক্যাপসিকাম চাষে আর্থিক লাভের হিসাবটা বেশ চমকপ্রদ। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এক বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম আবাদ করতে বীজ, সার এবং মালচিং পেপারসহ খরচ হয় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। অথচ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সঠিক পরিচর্যা করলে সেই একই জমি থেকে ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকার ফসল বিক্রয় করা সম্ভব। অর্থাৎ, প্রথাগত ধান বা রবি শস্যের তুলনায় এই ফসলে মুনাফার পরিমাণ তিন থেকে চার গুণ বেশি।

ধামঘর ইউনিয়নের পরমতলা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আমির হোসেন এবারই প্রথম তার ১ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করেছেন। তার চোখে-মুখে এখন সাফল্যের আভা। আমির হোসেন বলেন, "শুরুতে ভয় ছিল এই বিদেশি সবজি আমাদের মাটিতে কেমন হবে। কিন্তু উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বীজ, সার, কীটনাশক আর মালচিং পেপার পেয়ে সাহস পাই। এখন গাছে প্রচুর ফল এসেছে। আশা করছি, বাজারে ভালো দাম পেলে খরচ বাদে বড় অংকের লাভ করতে পারব।"

মুরাদনগর উপজেলা কৃষি অফিসার জনাব পাভেল খান পাপ্পু এই উদ্যোগ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি জানান, "ক্যাপসিকাম একটি 'হাই ভ্যালু ক্রপ'। বাজারে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আমরা কৃষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা দিয়ে উৎসাহিত করছি। এবারই প্রথম মুরাদনগরে এত বড় পরিসরে চাষ হয়েছে। ফলন যেমন হয়েছে, তাতে আমরা নিশ্চিত যে আগামী মৌসুমে এই উপজেলায় ক্যাপসিকাম চাষের পরিধি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।"

অর্থনীতিতে নতুন হাওয়া স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মুরাদনগরের মতো কৃষিপ্রধান এলাকায় ক্যাপসিকামের মতো অর্থকরী ফসলের সম্প্রসারণ শুধু কৃষকের ভাগ্যই বদলাবে না, বরং কুমিল্লার সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন মাত্রা। স্বল্প সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় শিক্ষিত যুবকরাও এখন এই আধুনিক চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন