ফুলবাড়ীর ছোট যমুনা এখন ময়লার ভাগাড়, অস্তিত্ব সংকটে নদী


আমিনুল ইসলাম, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি :

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌরশহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে। একসময় প্রাণবন্ত এ নদী এখন পানিশূন্য হয়ে অনেক স্থানে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার প্রবণতা—ফলে নদীর বিভিন্ন অংশ এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা নদীটি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুলবাড়ী পৌরসভার স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পৌর বাজারের দৈনন্দিন ময়লা-আবর্জনা ছোট যমুনা নদীর বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে ফুটব্রিজের নিচসহ নদীর তলদেশে আবর্জনার স্তূপ জমে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুলবাড়ী-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে নদীর ওপর নির্মিত বড় সেতুর (জোড়া ব্রিজ) নিচে এবং পৌর বাজার সংলগ্ন ফুটব্রিজের পূর্বপ্রান্তে নিয়মিতভাবে ময়লা ফেলা হচ্ছে। ফলে ওই অংশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং পথচারীদের চলাচল কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তিন-চার বছর আগেও এখানে অল্প পরিমাণে বর্জ্য ফেলা হলেও বর্তমানে পৌরসভার অধিকাংশ ময়লাই এখানে ফেলা হচ্ছে। গৃহস্থালি বর্জ্যের পাশাপাশি কাঁচাবাজারের পচনশীল আবর্জনাও নিয়মিত নদীতে ফেলা হচ্ছে।


প্রবীণদের ভাষ্য, ১৯৮০-এর দশকেও ছোট যমুনা নদী ছিল এ অঞ্চলের প্রাণ। বর্ষা মৌসুমে নদী ভরে উঠত, আর শুষ্ক মৌসুমেও নৌকা চলাচল করত। নদীপথে পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল সচল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমা, অবৈধ দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে নদী ভরাট হয়ে গেছে এবং তীর দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা।

পরিবেশবিদদের মতে, নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি একটি অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই ছোট যমুনা নদী রক্ষায় পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় অবহেলা ও দূষণের কারণে একসময় নদীটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে।

ফুলবাড়ী সম্মিলিত সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি হামিদুল হক বলেন, “নদীটি দ্রুত খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাবে না।”

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার জানান, দেশের মিঠাপানির জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি বর্তমানে হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া এবং পানি দূষণ এর প্রধান কারণ। নদী-নালা ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার ফলে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।

ফুলবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লুৎফুল হুদা চৌধুরী বলেন, জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ এলেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা ফেরত গেছে। তিনি দাবি করেন, পৌরসভা থেকে নদীতে কোনো বর্জ্য ফেলা হচ্ছে না।

ফুলবাড়ী পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামিউল ইসলাম বলেন, নদীতে বর্জ্য ফেলার বিষয়টি তাঁর জানা নেই; বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, নদী দূষণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ছোট যমুনা নদীর দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পৌরসভাকে অবহিত করা হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন