নাটোরে উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ


  • স্থানীয়দের আতঙ্ক, প্রশাসনের নীরবতা

আব্দুল মজিদ, নাটোর : উপজেলা পর্যায়ে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে।গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বাস্তবায়নে চলমান এ প্রকল্পটির কাজ করছে চট্টগ্রামভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কস।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর কার্যাদেশ (এনওএ) প্রদান করা হয় এবং ১২ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রায় ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

তবে কাজের শুরু থেকেই অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, প্রকল্পের কাজ চুক্তিপত্র ও নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী হচ্ছে না। এমনকি নিয়ম অনুযায়ী সাইটে ওয়ার্ক অর্ডার সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা রাখা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার সাব্বির বলেন, “ওয়ার্ক অর্ডার সাইটে রাখার নিয়ম থাকলেও আমার প্রয়োজন হচ্ছে না।” কাজের সিডিউল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। বরং তিনি বলেন, “বালু কিংবা মাটি যেকোনো একটি ব্যবহার করেই কাজ করা যায়।”


অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, সিডিউল বহির্ভূতভাবে চিকন রড ব্যবহার করে পাইলিংয়ের খুঁটির ঢালাই দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া নিম্নমানের ইট, অতিরিক্ত বালু ও কম সিমেন্ট ব্যবহার করে নির্মাণকাজ পরিচালিত হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকৌশলী সাব্বির বলেন, “আমরা সঠিক নিয়ম মেনেই কাজ করছি।”

স্থানীয় বাসিন্দা ‘ডাবলু’ নামের একজন অভিযোগ করে বলেন, “পাইলিং ও দেয়াল নির্মাণে বালু বেশি এবং সিমেন্ট কম ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করলে ঠিকাদারের লোকজন মামলা দেওয়ার ভয় দেখায়।”

রবিউল নামের আরেক বাসিন্দা জানান, “মাঠের বিভিন্ন স্থানে গর্ত রয়েছে। প্রথমে বালু দিয়ে ভরাট করার কথা থাকলেও শুরু থেকেই মাটি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে।”

স্থানীয় বিএনপি নেতা মুক্তার হোসেন বলেন, “নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে, মিস্ত্রীরাও তা স্বীকার করেছে। আমরা সঠিকভাবে কাজ করার কথা বললে উল্টো আমাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তিপত্র দেখাতেও অনীহা প্রকাশ করছে।”

আরেক বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, “পাইলিংয়ের রডের বালা তৈরিতে ১২ মিলিমিটারের পরিবর্তে ৮ মিলিমিটার রড ব্যবহার করা হয়েছে। মিস্ত্রী প্রথমে ভুল স্বীকার করলেও পরে তা সংশোধন করা হয়নি। এমনকি অনেক কাজ রাতে করা হচ্ছে, যাতে অনিয়ম ধরা না পড়ে।”

স্থানীয় তরুণ লিটন জানান, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এক মাসেও কোনো তদন্ত শুরু হয়নি। তিনি বলেন, “সরকারি প্রকল্পে সাধারণত তদারকি থাকে, কিন্তু এখানে আজ পর্যন্ত কাউকে দেখিনি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আমরা নিজেরাই আতঙ্কে আছি।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, “আমরা সঠিকভাবেই কাজ করছি। কিছু অসৎ ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়মিত কাজ পরিদর্শন করেন এবং আমাদের সব ধরনের নথিপত্র তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।”

এদিকে স্থানীয়দের লিখিত অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি, তবে বিষয়টি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন হওয়ায় সরাসরি আমার কিছু করার নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ জানাতে হবে।” তিনি আরও জানান, কাজের সব নথিপত্র তার কাছে রয়েছে, এমন দাবি সঠিক নয়।

উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুর রহমান বলেন, “আমরা বিষয়টি নজরে রেখেছি। তবে সমস্যার সমাধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তিপত্র উন্মুক্ত করা জরুরি। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এটি প্রয়োজন। আমরা এটা নিয়ে আমাদের যা করণীয় করব।”

এদিকে স্থানীয়দের জোর দাবি, কয়েক কোটি টাকার এই প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রশাসনিক তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন