গণতন্ত্রের প্রহরী সাংবাদিকতা: নাটোরের কর্মশালায় উঠে এলো সত্য ও মানবাধিকারের কথা


আব্দুল মজিদ, নাটোর : গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আর সেই স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান বাহক সাংবাদিকতা। রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে গণমাধ্যম। সত্য তুলে ধরা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশের মাধ্যমে সাংবাদিকরা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেন। এমনই নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে নাটোরে অনুষ্ঠিত "গণতন্ত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা" শীর্ষক এক কর্মশালায়।

মঙ্গলবার (৯ জুন) নাটোর শহরের ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি হলরুমে  বিকেল সাড়ে তিনটায় নীডা সোসাইটি ও ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার (ডিএইচআরডি) নাটোরের আয়োজনে এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর সহযোগিতায় এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে অংশ নেন জেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সভাপতিত্ব করেন অনির্বাণ কনভেনশন (এইচআরডিএন)-এর সভাপতি প্রভাতী রানী বসাক। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান।

সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্র: অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভের অন্যতম হলো গণমাধ্যম। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাংবাদিকরা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে জনগণের সামনে তুলে ধরেন, ফলে সাধারণ মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অবহিত হন।

বক্তারা উল্লেখ করেন, সমাজে যখন কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, তখন সাংবাদিকরাই প্রথম তা জনগণের সামনে তুলে ধরেন। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পান।

মানবাধিকার রক্ষায় সাংবাদিকদের ভূমিকা

কর্মশালার আলোচনায় উঠে আসে যে, মানবাধিকার রক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু, নারী, শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিংবা নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর গণমাধ্যমের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে যায়।

বক্তারা বলেন, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের লক্ষ্য একই—সত্য উদঘাটন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। তাই দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হতে পারে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান

আলোচনায় সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। 

বক্তারা বলেন, সত্য প্রকাশের কারণে অনেক সময় সাংবাদিকরা নানামুখী চাপ, হুমকি ও ঝুঁকির সম্মুখীন হন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকলে গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত আয়োজন

কর্মশালায় নাটোর প্রেসক্লাবের সভাপতি শহিদুল হক সরকার, সাবেক সভাপতি ফারাজি রফিক বাবন, ইউনাইটেড প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন, সাংবাদিক মুক্তার হোসেন, জুলফিকার হায়দার জোজেফ, কামাল মৃধাসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে গুজব ও অপতথ্যের ঝুঁকিও। এ প্রেক্ষাপটে দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও মানবিক সাংবাদিকতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। নাটোরের এই কর্মশালাটি সেই দায়িত্ববোধকে আরও জাগ্রত করেছে বলে মনে করেন অংশগ্রহণকারীরা। গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী করতে সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার আন্দোলনের যৌথ পথচলাই হতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম হাতিয়ার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন