দুলাল বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : একটি জাতির কাঙ্খিত সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার ওপর, আর সেই শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। অথচ সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত পেশাগুলোর একটি আজও শিক্ষকতা। সেই বাস্তবতার মধ্যেই নিজের মেধা, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ৯৯ নং নিলখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হাফিজা খানম। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬-এর চূড়ান্ত মূল্যায়নে তিনি ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক (নারী) নির্বাচিত হয়ে শুধু গোপালগঞ্জ নয়, পুরো দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে গর্বিত করেছেন।
একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি একটি জাতির স্বপ্ন নির্মাণ করেন। শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম, নৈতিকতা, মানবিকতা ও জ্ঞানচর্চার বীজ বপন করেন। হাফিজা খানম সেই মহান দায়িত্বকে পেশা নয়, বরং সেবার ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক যত্ন, সহশিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা, উৎসাহ - উদ্দীপনা, সৃজনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কঠোর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পেরিয়ে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সহজ কোনো বিষয় নয়। এটি বছরের পর বছর পরিশ্রম, ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের ফল। এর আগেও ২০২২ ও ২০২৪ সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নারী সহকারী শিক্ষক এবং ২০২৪ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি। এবারের অর্জন সেই ধারাবাহিক সফলতারই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।
আজ যখন সমাজে নানা পেশার মানুষের সাফল্য নিয়ে আলোচনা হয়, তখন জাতি গড়ার কারিগরদের অবদান অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। অথচ একজন ভালো শিক্ষকই একজন ভালো ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিচারক, প্রশাসক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক তৈরির কারিগর। তাই হাফিজা খানমের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদা ও গুরুত্বের একটি উজ্জ্বল স্বীকৃতি।
গোপালগঞ্জের মানুষ আজ গর্বিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন—সবখানেই প্রশংসিত হচ্ছেন হাফিজা খানম। তার এই অর্জন নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য অনুপ্রেরণা, আর শিক্ষার্থীদের জন্য অধ্যবসায় ও সততার এক জীবন্ত উদাহরণ।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চায়, তাহলে হাফিজা খানমের মতো শিক্ষকদের আরও বেশি সম্মান, সুযোগ ও প্রণোদনা দিতে হবে। কারণ জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগরদের সম্মানিত করলেই কেবল একটি আলোকিত প্রজন্ম এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব।
হাফিজা খানমের এই সাফল্য প্রমাণ করেছে—নিঃস্বার্থ শ্রম, সততা ও শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা থাকলে একজন শিক্ষকও হয়ে উঠতে পারেন পুরো জাতির গর্ব।
হাফিজা খানমের এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয় ; এটি গোপালগঞ্জ জেলার শিক্ষা পরিবারের ক্ষেত্রেও এক গর্বের মাইল ফলক । শিক্ষা ক্ষেত্রে তার এই অর্জন আগামী দিনের শিক্ষক সমাজকে আরো অনুপ্রাণিত করবে । পুরো জাতি হবে উপকৃত।
