ভোলায় জেলেদের খাদ্য প্রণোদনায় অনিয়ম,তালিকায় নাম নাই জেলেদের


মিজানুর রহমান, ভোলা প্রতিনিধি : ভোলা সদর উপজেলায় নিষিদ্ধ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত বিশেষ (খাদ্য কর্মসূচি) প্রণোদনা বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত জেলেদের নাম বাদ পরলেও সরকারি এই সহায়তা পেয়েছেন-আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ তাদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এ নিয়ে শনিবার থেকে ভোলায় আলোচনার ঝড় বইছে।

১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬০ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার এই খাদ্য সহায়তা বরাদ্দ দেয়। ভোলা সদর উপজেলায় প্রায় ২৪০০ জেলের জন্য জনপ্রতি ১২ কেজি আটা, ৮ কেজি ডাল, ১০ লিটার তেল, ১৬ কেজি আলু, ৪ কেজি চিনি ও ৪ কেজি লবণ বরাদ্দ ছিল।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, জেলায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার জেলে এই সহায়তার আওতায় আসার কথা। ২৪ এপ্রিল সকালে ভোলা সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে জেলা প্রশাসক ডাঃ শামীম রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনের পর মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, মৎস্য অফিসের উপজেরা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভুইয়া, জেলা অফিসের সহকারী জাহাঙ্গীর আলমসহ অন্যান্য কর্মচারীরা মিলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে টাকার বিনিময়ে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনসহ আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীকে জেলেদের নাম তালিকায় র্ভুক্ত করে খাদ্য সামগ্রী তাদের মধ্যে বিতরন করেছেন।

ভোলা সদরের রাজাপুর, পূর্ব ইলিশা, ধনিয়া, শিবপুর, ভেদুরিয়া ও ভেলুমিয়া ইউনিয়নের বহু প্রকৃত জেলে বর্তমানে খাদ্য সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শিবপুর ইউনিয়নের জেলে মোঃ জামাল, মোঃআমানউল্লাহ, মোঃ আজিজুল ও শারীরিক প্রতিবন্ধী জেলে মোঃ হারুন মাঝি জানান, তালিকা প্রণয়নের সময় তাদের জেলে কার্ড সংগ্রহ করা হলেও চূড়ান্ত তালিকায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে,তালিকায় স্থান পাওয়া অনেকেই জেলে পেশার সঙ্গে মোটেও সম্পৃক্ত নন। অভিযোগ রয়েছে, সদর মৎস্য অফিসের অফিস সহকারী মোঃ ইউসুফের সহায়তায় তার আপন দুই চাচাত ভাই আব্দুরব ও ব্যবসায়ী মোঃ আবদুল মালেকের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে সরকারি খাদ্য সহায়তা গ্রহণ করেছেন। তারা আওয়ামীলীগের নেতা। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহকারী ইউসুফ দাবি করেন, তার চাচাদের নাম কীভাবে তালিকায় এসেছে এবং তারা বর্তমানে কী পেশায় নিয়োজিত তা তিনি জানেন না। জেলেদের অভিযোগ মৎস্য অফিসের স্টাফ ও রিভার গার্ড মোঃ জাফর  তার-শ্বশুর, ভায়রা, পিতাসহ নিজের নামও একাধিক তালিকায় নাম দিয়ে খাদ্য নিয়েছেন। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ অপেশাদার জেলের নাম তালিকায় টিকিয়ে রাখা এবং অনলাইন ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার নামে তারা সবাই মিলে সহ¯্রাধীক লোকের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত চাদা নিয়ে থাকেন।

জাফর দির্ঘদিন টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পেশার মানুষকে জেলে কার্ড পাইয়ে দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে নদীতে মাছ শিকারের সুযোগ করে দেওয়ার পুরোনো অভিযোগও রয়েছে। তবে অভিযুক্ত রিভারগার্ড মোঃ জাফর টাকা নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেন।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্য ও জেলে সমিতির সভাপতি মো. গিয়াসউদ্দিন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সর্ব প্রথম প্রকৃত জেলেদের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের সাথে কোনো পরামর্শ না করে মৎস্য অফিসের স্টাফ জাফর, আওয়ামীলীগের মামুন মিলে অধিকাংশ অপেশাদার লোকের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ঢুকিয়েছে। বিশেষ করে শিবপুর ইউনিয়নে ২৭০টি নামের বিপরীতে জাফর ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও কাঠমিস্ত্রিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে।

ত্রাণ না পেয়ে বেদে সম্প্রদায়ের এক নারী জেলে অশ্রুভেজা চোখে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওই স্যার আমারে মালামাল দিব কইয়াও দিল না! স্বামীডায় আইজ অনেকদিন ধইরা অসুস্থ, নৌকায় কোনো খাবার নাই। আল্লাহ্ এর বিচার করব।

অনিয়মের বিষয়ে সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন,তড়িঘড়ি করে তালিকা করতে গিয়ে কিছু অপেশাদার জেলের নাম যুক্ত হয়েছে। এ জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহামদ ইকবাল হোসেন জানান, দায়ীত্ব অবহেলার কোন সুযোগ নাই, আর দুঃখতো তাদের কপালে এমনিতে চেপে বসেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন