নারায়ণগঞ্জে ৭০ বছরের দখলকৃত জমি উদ্ধার করলেন জেলা প্রাশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা

উদ্ধার করা ২৩ একর জমিতে দৃষ্টিনন্দন ইকোপার্ক করার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। ছবি : ডেইলি নিউজ বিডি

  • ৭০ বছরের দখলকৃত জমি অবশেষে সরকারের মালিকানায়
  •  ২৩ একর জমি এখন ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত 
  • উদ্ধার করা জমিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দৃষ্টিনন্দন ইকোপার্ক করার ঘোষণা জেলা প্রশাসকের 

 এস এম মিরাজ হোসাইন টিপু : নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার বিশনন্দী ফেরিঘাট সংলগ্ন নারায়ণগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের পাশে প্রায় ২৩ একর জমি প্রায় ৭০ বছর ধরে বেদখল অবস্থায় ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন এ সম্পত্তি রেখে ভারতে চলে যান প্রকৃত মালিকরা। এরপর থেকেই অব্যবস্থাপনার সুযোগে এ জমিতে চাষাবাদ শুরু করে ভোগদখলে রেখেছিল স্থানীয় শতাধিক পরিবার। বিগত আওয়ামী লীগের সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবুর লোকজন ২০২০ সালে কৃষকদের কাছ থেকে জমি দখলে নিয়ে অবৈধ বালুর ব্যবসাও শুরু করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরাও এ জমি দখলে নিয়ে যায়। এর ফলে এলাকায় ফের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়।

এমন খবর পাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ওই জমি উদ্ধারে আড়াইহাজার উপজেলা প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দেন, যেন এক ইঞ্চি জমিও আর বেদখল না হয়। জমিটি মালিকবিহীন হিসেবে খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করারও নির্দেশ দেন তিনি। অবশেষে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে ৭০ বছরের বেদখলে থাকা সেই জমির উদ্ধার প্রক্রিয়ার অবসান ঘটেছে।

৬০ কোটি টাকা মূল্যের সেই জমি এখন সরকারের মালিকানায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। উদ্ধারকৃত ২৩ একর জমি এখন সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বেদখলে থাকা সেই সম্পত্তিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ইকোপার্ক তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। জেলা প্রশাসকের এমন কঠোর পদক্ষেপ ও মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে আড়াইহাজার উপজেলার বিশনন্দী ফেরিঘাট এলাকার স্থানীয় সাধারণ জনগণ।


 আড়াইহাজার উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নঈম উদ্দীন বলেন, দীর্ঘযুগ ধরে যারা মালিকানা দাবি করে ওই জমি বেদখলে রেখে ভোগ করে আসছিল, আমরা সব দাবিদারকে জমির কাগজপত্র জমা দিতে বলেছিলাম। এরপর এ বিষয়ে একটি ‘গণবিজ্ঞপ্তি’ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অনেকেই কাগজপত্র জমা দেন। পরে শুনানিতে যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, সবাই ভুয়া মালিকানা সেজে অবৈধভাবে ভোগদখল করে আসছিল। এরপর আমারা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে প্রতিবেদন আকারে দাখিল করেছি। বেদখলে থাকা ২৩ একর জমিটির বর্তমান বাজার মুল্য আনুমানিক ৬০ কোটি টাকা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এস কে মো: মামুনুর রশীদ দ্রুত এ সংক্রান্ত ফাইল জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠান। পরে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম গত ১৬ সেপ্টেম্বর নথিতে স্বাক্ষর করে ২৩ একর জমিটি সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার আদেশ দেন।

স্থানীয় বিশনন্দী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আব্দুল হামিদ বলেন, ছোটবেলায় দেখেছি- আমার দাদা-বাবারা এ জমিতে চাষ করতেন। কিন্তু ২০২০ সালে সাবেক এমপি নজরুল ইসলামের লোকজন আমাদের কাছ থেকে জমি বেদখল করে নেয়। সরকার যদি ইকোপার্ক করে, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। শুধু চাই, আর যেন প্রভাবশালীরা দখল করতে না পারে।
বিশনন্দী ফেরিঘাট জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. মতিউর রহমান বলেন,এখানে দীর্ঘদিন আমরা শতাধিক পরিবার ভোগদখল করে আসছিলাম। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের সময় জমি আমাদের কাছে থেকে বেদখল হয়। সরকার যদি এখন নিজের নামে জমি নিয়ে থাকে, তাতে কোনো আপত্তি নেই। তবে যেন আর দখলদারি না হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমান জেলা প্রশাসকের কঠোর পদক্ষেপের কারণে দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছর ধরে বেদখলে থাকা ৬০ লাখ টাকা মূল্যের ২৩ একর জমি সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করায় সাধুবাজ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক ঘোষিত এ জমিতে ইকোপার্ক গড়ে তোলার যে মহতী উদ্যোগ নিয়েয়ে তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।

প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর প্রতিবেদন এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সুপারিশ যাচাইয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ অনুযায়ী জমিটি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, এই জমিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি দৃষ্টিনন্দন ইকোপার্ক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে ভবিষ্যতে জমিটি আর বেদখল হবে না। পাশাপাশি স্থানীয়রা পর্যটন সুবিধা থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন