ফ্রি চিকিৎসা বন্ধ, সেবা থেকে বঞ্চিত হাজারো দরিদ্র মানুষ

সিপন আহমেদ, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : নির্বাচনী আচরণবিধির অভিযোগের জেরে মানিকগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি মানবিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার—স্বাস্থ্যসেবা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

গত বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সাটুরিয়া উপজেলার ফুকুরহাটি ইউনিয়নের রাইল্যা মাদ্রাসা কবরস্থানের পশ্চিম পাশের মাঠে ১৮তম ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করেছিল মুন্নু ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের পর প্রশাসন ওই দিনের ক্যাম্পের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বাংলাদেশ জাসদ মনোনীত প্রার্থী মো. শাহজাহান আলী (সাজু মল্লিক) জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ক্যাম্পের কোথাও আফরোজা খানম রিতার ছবি সংবলিত কোনো ব্যানার বা ফেস্টুন দেখা যায়নি। একইভাবে ক্যাম্প আয়োজকদের পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের ভোট চাওয়ার কার্যক্রমের খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে হঠাৎ করে ফ্রি চিকিৎসা সেবা বন্ধ হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, এই ক্যাম্প ছিল দরিদ্র মানুষের একমাত্র ভরসা। অভিযোগকারী প্রার্থীর নাম উল্লেখ করে স্থানীয়রা বলেন, “সাজু মল্লিক মেডিকেল ক্যাম্প বন্ধ করিয়ে আমাদের হক নষ্ট করেছেন।”

ফুকুরহাটির এক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য এই ক্যাম্প ছিল আশীর্বাদ। ওষুধ কেনার টাকা নেই, ডাক্তারের ফিও দেওয়া সম্ভব না। এখন এই সেবাটাই বন্ধ হয়ে গেল।”

জানা গেছে, গত বছরের ২৫ অক্টোবর মানিকগঞ্জ পৌরসভার বান্দুটিয়া এলাকায় অবস্থিত আফতাব উদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রথমবারের মতো ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করে মুন্নু ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। এতে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টরা সহযোগিতা করেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলা ওই ক্যাম্পে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাপত্র, ইসিজি, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ পান।

সেবার ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় পরবর্তীতে সপ্তাহে দু’দিন করে বিভিন্ন ইউনিয়নে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। গত বছরের ২৫ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১৭টি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ পেয়েছেন। কোনো কোনো ক্যাম্পে একদিনেই তিন হাজারের বেশি মানুষ সেবা নেন।

এই ক্যাম্পগুলোতে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও প্রসূতি, অর্থোপেডিক্স, কার্ডিওলজি, নাক-কান-গলা, ডেন্টাল, চর্ম ও যৌন, চক্ষু এবং শিশু ও নবজাতকসহ—মোট ১০টি বিভাগের ৩০ জন চিকিৎসকসহ শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী সেবা প্রদান করেন।

সেবাগ্রহীতাদের এক সপ্তাহের ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। পাশাপাশি পরবর্তীতে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসায় ৩০ শতাংশ ছাড় পাওয়ার জন্য বিশেষ কার্ডও বিতরণ করা হয়।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নির্বাচনকালীন বিধিনিষেধ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি মানবিক চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ করার আগে বিকল্প বা সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া যেত। 

তাঁদের মতে, ৪০ হাজারের বেশি মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ—যার সুফল থেকে দরিদ্র মানুষকে বঞ্চিত করা দুঃখজনক।

এ বিষয়ে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. জুলফিকার আহমেদ আমিন বলেন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে মুন্নু গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হারুনার রশিদ খান মুন্নু ‘মুন্নু ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নানাভাবে দরিদ্র মানুষের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী এতে সহযোগিতা করেন।

তিনি বলেন, গত চার মাস ধরে এই মানবিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়েছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন