মান্দায় ছ'মিল ফার্নিচারে আগুন লাগাকে কেন্দ্র করে, জোরপূর্বক স্বীরোক্তির অভিযোগ



এ,বি,এম,হাবিবুর রহমান : নওগাঁর মান্দা উপজেলায় কাশোপাড়া আন্ধারিয়া পাড়ায় একটি ছ-মিল ফার্নিচারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। আগুনের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ যখন তদন্তে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সন্দেহভাজন এক যুবককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে নির্যাতন করে ‘শেখানো স্বীকারোক্তি’ আদায় এবং তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মিল মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৫-০২-২০২৬ ইং তারিখ রাতে উপজেলার কাশোপাড়া ইউনিয়নের আন্ধারিয়া পাড়ায় একটি ছ-মিল ফার্নিচারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। খবর পেয়ে মান্দা থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। থানার অফিসার ইনচার্জ কে এম মাসুদ রানা সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখেন। মিলের মালিক সাইদুর রহমান লিখিত অভিযোগ দিলে পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত শুরু করে।

কিন্তু মামলার তদন্ত চলাকালেই গত ২৩-০২-২০২৬ ইং সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, মিল মালিকের ছেলে দুলাল, আইজুল, জাহিদ, জয়বুল হোসেন বাদশা এবং আরও ২/৩ জন সহযোগী মিলে সন্দেহভাজন আলমগীরকে বাড়ি থেকে ডেকে বের করে। পরে তার চোখ বেঁধে মোটরসাইকেলে তুলে নওগাঁ শহরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

আলমগীর জানায়, তাকে একটি বাসের ভেতরে নিয়ে প্রথমে বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে চোখের বাঁধন খুলে ছুরি ও বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্দিষ্ট কিছু কথা বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়— “বিপ্লব ও মাসুদ আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে আগুন লাগাতে বলেছে, তাই আমি আগুন দিয়েছি।” নিরুপায় হয়ে আলমগীর সেই কথাগুলো বললে তা ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপর সারারাত ধরে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলে জানায়।

এজাহারে আরও বলা হয়, আলমগীরের কাছ থেকে একটি বাটন মোবাইল ফোন ও ৩৬০ টাকা কেড়ে নেয় তারা এবং বিষয়টি পুলিশকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরদিন ইফতারের পর তাকে মান্দা থানার কুলিহার মোড়ের দক্ষিণে ফেলে রেখে যায় অভিযুক্তরা। পরে স্থানীয় লোকজন ও তার সাবেক স্ত্রীর স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে তার মা এর কাছে ফোনে জানালে, তার মা কামেলা খাতুন ঘটনাস্থলে গিয়ে, ছেলেকে নিয়ে, বয়লারে তার কাজের জায়গায় নিয়ে যায়। 

আলমগীরের মা কামেলা খাতুন জানান, সারারাত তার ছেলে জ্বরে কাঁপছিল এবং আতঙ্কে ঘুম ভেঙে চমকে উঠছিল। পরেরদিন স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে নওগাঁ সদর হাসপাতাল এ ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে তাকে কর্মস্থল বয়লারে নিয়ে যায় তার মা। উল্লেখ্য আলমগীরে বাবা তার মাকে ছেড়ে দিয়ে, অন্যত্র সংসার করার কারণে, তার মা বয়লারে কাজ করে ও আলমগীর ইটভাটায় কাজ করে জীবীকা নির্বাহ করে।

কামেলা খাতুন জানান, অভিযুক্তরা তাকেও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে— মামলা করলে বা পুলিশকে কিছু জানালে মা-ছেলে দু,জনকেই হত্যা করা হবে। এ ঘটনায় তিনি ৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২/৩ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন।

অভিযুক্ত দুলাল ও জাহিদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা ফোনে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সরাসরি দেখা করার কথা বলে। তবে পরবর্তীতে তারা আর কোনো যোগাযোগ করেনি।

এ বিষয়ে মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ কে এম মাসুদ রানা বলেন, “দু’পক্ষেরই লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আইন সবার জন্য সমান। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। 

ঘটনাটি এখন এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহল মনে করছেন, থানা পুলিশ যেহেতু তদন্ত করছে,সেখানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও আইনের পরিপন্থী।  তদন্তের আগেই জোরপূর্বক বা বল প্রয়োগ করে সন্ধেহভাজনকে ‘স্বীকারোক্তি’ ভিডিও প্রকাশ— আইন ও ন্যায়ের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে শেষ পর্যন্ত কী সত্য উদঘাটিত হয় এবং অভিযোগের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন