রনজিত কুমার শীল, চট্টগ্রাম : শীতের তীব্রতা ও অসহায় মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় চট্টগ্রাম জেলার মানবিক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা গতকাল ৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার গভীর রাতে সশরীরে উপস্থিত থেকে শহরাঞ্চল থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিভিন্ন জেলে পল্লী ও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করেছেন। শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমের আওতায় আকমল আলী ঘাট জেলে পল্লী, রানী রাসমনির ঘাট জেলে পল্লী এবং উত্তর কাট্টলী জেলে পল্লী-এই তিনটি জেলে পল্লীতে বসবাসরত দরিদ্রজেলে পরিবারগুলোর মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ভাসমান ও অসহায় মানুষের মাঝেও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। এসব স্থানে মোট ৫০০টি কম্বল বিতরণ করা হয়।
জেলা প্রশাসক নিজে গভীর রাতে দুর্গম জেলে পল্লীতে উপস্থিত হয়ে অসহায় জেলে পরিবার, নারী ও শিশুদের হাতে কম্বল তুলে দেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। স্থানীয় জেলেরা জানান, এর আগে কোনো জেলা প্রশাসক এত রাতে সরাসরি জেলে পল্লীতে এসে কম্বল বিতরণ করেননি।
এ সময় জেলে পল্লীর বাসিন্দারা তাদের সন্তানদের জন্য স্কুল করার জন্য আবেদন জানান। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে স্কুল সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে তিনি জেলেদের প্রত্যেকের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন।
জেলেদের উদ্দেশ্যে মানবিক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন,“জেলেদের জীবনমান পরিবর্তন করতে হবে। যে পদ্ধতিতে আপনার বাবু দাদারা মাছ ধরতেন বা জীবনযাপন করতেন, সেই পুরনো ধারায় আর চলা যাবে না। এভাবে চলতে পারে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জেলেদের জীবিকা পদ্ধতি পরিবর্তন করে স্বনির্ভর হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জেলেদের টেকসই জীবনমান নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।”
এ বিষয়ে আকমল আলী ঘাট জেলে পল্লীর জেলেদের নেতা দুলাল ও রানী রাসমনির ঘাট জেলে পল্লীর জেলে নেতা খেলন দাস বলেন, “শহর থেকে এত দূরের জেলে পল্লীতে গভীর রাতে জেলা প্রশাসক নিজে এসে আমাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের জন্য অভাবনীয়। আগে কখনো এমন দেখিনি।”
জেলেরা জানান, গভীর রাতে এ রকম মানবিক ডিসিকে একেবারে কাছে পেয়ে তারা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ও আবেগাপ্লুত। শীতার্ত জেলে পরিবারগুলোর কষ্ট লাঘব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার কথা বলায় তারা জেলা প্রশাসকের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় দোয়া করেন।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে কম্বল বিতরন করেন। এ সময় নূর কায়াস নামে এক নারী তার তিন সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় অবস্থান করছিলেন, যার একটি শিশু প্রচন্ড শীতে কাঁপছিল। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নজরে এলে জেলা প্রশাসক খাবারের প্রয়োজন বিবেচনায় আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন এবং তার বড় সন্তান আছিয়ার পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
এ শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ শরীফ উদ্দীন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ ছাইফুল্লাহ মজুমদারসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত থেকে সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করেন। শীতের এই দুঃসময়ে জেলা প্রশাসকের মানবিক, দূরদর্শী ও সাহসী উদ্যোগ শীতার্ত মানুষের মাঝে শুধু উষ্ণতা নয়, বরং শিক্ষা, পরিবর্তন ও আত্মনির্ভরতার দৃঢ় বার্তা পৌঁছে দেয়।

