দেড় শতকের দীপ্তি: সৈয়দপুরের ঐতিহ্যের প্রতীক চিনি মসজিদ



মোঃ নাজমুল হুদা,  সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি :

উত্তরাঞ্চলের শিল্পনগরী নীলফামারীর সৈয়দপুরের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেই ইসলামবাগ এলাকায় নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো ইতিহাস চিনি মসজিদ। সময়ের বহু পালাবদল, প্রজন্মের পরিবর্তন আর নগরায়নের ঢেউ পেরিয়েও দেড় শতকের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে আজও সমান দীপ্তিতে উজ্জ্বল এই স্থাপনা।

দূর থেকে চোখে পড়ে এর গম্বুজ আর মিনারের সারি; কাছে গেলে মুগ্ধ করে দেয় দেয়ালজুড়ে বসানো চিনামাটির শিল্পকর্ম। সূর্যের আলো পড়লে যেন ঝিলমিলিয়ে ওঠে অতীতের গল্প। একদিকে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, অন্যদিকে শিল্পরুচির অপূর্ব প্রকাশ দুইয়ের মেলবন্ধনে চিনি মসজিদ হয়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক নিদর্শন।

১৮৬৩ সালে স্থানীয় রেলওয়ে কর্মচারী হাজী বাকের আলী ও হাজী মুকু ছন ও বাঁশ দিয়ে নির্মাণ করেন মসজিদের প্রাথমিক কাঠামো। সেই ছোট্ট ইবাদতখানা ধীরে ধীরে এলাকাবাসীর সহায়তায় টিনের ঘরে রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন বাড়ে, স্বপ্নও বড় হয়। স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে গড়ে ওঠে তহবিল, যুক্ত হন স্থানীয় মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দা হাজী আবদুল করিম নিজ হাতে প্রণয়ন করেন নকশা। তাঁর পরিকল্পনায় ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৯ ফুট প্রস্থের পাকা ভবন নির্মিত হয়। কলকাতা থেকে সংগ্রহ করা হয় ২৪৩টি মার্বেল পাথর। পাশাপাশি প্রায় ২৫ টন ভাঙা চিনামাটির কাপ-পিরিচের টুকরো দিয়ে সাজানো হয় দেয়াল। এই ব্যতিক্রমী অলংকরণই মসজিদটিকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য আর সেখান থেকেই নাম হয়েছে ‘চিনি মসজিদ’।

মসজিদের দেয়ালে চিনামাটির নকশায় ফুটে উঠেছে ফুল, গোলাপ, চাঁদ-তারা ও নৈসর্গিক দৃশ্য। চুন-সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত এ স্থাপনায় অনুসরণ করা হয়েছে মোগল স্থাপত্যরীতি। সাদা মার্বেল পাথরের মেঝে ও কারুকাজের সূক্ষ্মতা পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে রাজকীয় আবহ।

নির্মাণকাজে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অংশ নেন এলাকাবাসী। হিন্দু ধর্মাবলম্বী শঙ্ক মিস্ত্রির সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন যা এই স্থাপনাকে কেবল ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, সম্প্রীতির প্রতীকেও পরিণত করেছে।

সময়ের পরিক্রমায় ১৯৬৫ সালে দক্ষিণাংশ এবং স্বাধীনতার পর উত্তরাংশ সম্প্রসারণ করা হয়। মূল নকশা ও কারুকাজের সামঞ্জস্য বজায় রেখেই যুক্ত হয় নতুন অংশ। বর্তমানে তিনটি গম্বুজ ও ৫৪টি মিনার সমৃদ্ধ এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৫০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে থাকা দৃষ্টিনন্দন ফটক পুরো স্থাপনাকে দিয়েছে আরও নান্দনিক পরিপূর্ণতা।

সৈয়দপুর রেলস্টেশন থেকে পূর্ব-উত্তর দিকে দুই কিলোমিটার গেলেই দেখা পাওয়া যাবে চিনি মসজিদের। সৈয়দপুর বিমানবন্দর ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে অনন্য এই মসজিদের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। মসজিদে একসঙ্গে ১ হাজার ২০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের মোয়াজ্জিম হাফেজ আরিফ রেজা বলেন,“এই মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, এটি আমাদের গর্ব। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে এর সৌন্দর্য দেখতে। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে কাজ করে যে ইতিহাস গড়েছেন, তা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়।”

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “ঈদ বা জুমার দিনে এত মানুষ আসে যে পুরো এলাকা প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। পর্যটক বাড়লে আমাদের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।”

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সাবিহা নওশীন বলেন,“বইয়ে মোগল স্থাপত্যের কথা পড়েছি, কিন্তু এখানে এসে চিনামাটির এমন শিল্পকর্ম দেখে অভিভূত হয়েছি। এটি জাতীয়ভাবে আরও প্রচার পাওয়া উচিত।”

স্থানীয় শিক্ষক সবুজ মন্তব্য করেন,“এই মসজিদ আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জীবন্ত উদাহরণ। ইতিহাস সংরক্ষণে প্রশাসনের আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।”

আজ চিনি মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়এটি ইতিহাস, শিল্প ও সম্প্রীতির সম্মিলিত প্রতীক। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে দেড় শতকের এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও সমান দীপ্তিতে বহন করবে আমাদের সংস্কৃতি ও অতীতের স্বাক্ষর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন