আব্দুল মজিদ, নাটোর প্রতিনিধি : নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায় দিন-রাত পুকুর খননের নামে চলছে অবৈধ মাটি কাটার মহোৎসব। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে মাটি কাটছে, যা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনের নজর এড়াতে মাটি খেকোরা গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে। মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া মাটি কাটার কাজ চলে ভোর পর্যন্ত। এর ফলে একদিকে উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য ও কৃষি উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে, অনেকেই পুকুর সংস্কারের নামে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করলেও অনুমোদন না নিয়েই ভেকু দিয়ে খননকাজ শুরু করছেন। এমনই একজন জামনগর ইউনিয়নের ঘোষপাড়া এলাকার বাসিন্দা আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, “আমি প্রশাসনের অনুমতি পাইনি, কিন্তু মাঝপাড়ায় সরকারি রাস্তার কাজ করা ঠিকাদার প্রশাসনকে ম্যানেজ করে মাটি নিচ্ছে।”
তবে তার পুকুর থেকে উত্তোলিত মাটি বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের বেপরোয়া চলাচলে পাকা সড়কের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় কাদায় সড়ক পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
দয়ারামপুর থেকে নাটোর সদরে যাওয়ার পাকা সড়কের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হলেই কাদা জমে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মোটরসাইকেল চালক সাইফুল ইসলাম জানান, “পুকুর খননের মাটি বহনের কারণে রাস্তায় কাদা জমে পিচ্ছিল হয়ে গেছে। অফিসে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল নিয়ে পড়ে গিয়ে জামাকাপড় নষ্ট হয়েছে, আহতও হয়েছি। এ ধরনের দুর্ভোগ থেকে কি আমরা মুক্তি পাব না?”
তমালতলা কৃষি ও কারিগরি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও কৃষিবিদ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “এভাবে ফসলি জমি ধ্বংস করে পুকুর খনন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে, এমনকি একসময় দেশকে আমদানি নির্ভর হয়ে পড়তে হতে পারে। তাই সরকারিভাবে ফসলি জমিতে পুকুর খনন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, “রাতের আধারে মাটি কাটা হচ্ছে। আমরা মানুষকে আরও সচেতন করার চেষ্টা করছি। অনেক সময় ইটভাটার মালিকরা বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে পুকুর খননে উৎসাহিত করে। সাময়িক লাভের আশায় ফসলি জমি নষ্ট করলে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। খবর পেলেই গভীর রাতেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, জনসচেতনতা ও রাজনৈতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।”
স্থানীয়দের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বাগাতিপাড়ার কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
