পদোন্নতি বিতর্ক, মামলা-অভিযোগে অচল জোনাইল ডিগ্রী কলেজ


আব্দুল মজিদ, নাটোর : নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ডিগ্রী কলেজে শিক্ষকদের অভ্যন্তরিন কোন্দল কলহ, একের পর এক পালটা পালটি মামলা অভিযোগ ও অব্যবস্থাপনায় শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে। 

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রতিষ্ঠানে দাবীকৃত অর্থ প্রদান করা না হলে কোন শিক্ষকের পদোন্নতির ফাইল আটকে রাখা হয়। কলেজের ২-৩জন জ্যেষ্ঠ প্রভাষককে বাদ রেখে জুনিয়র শিক্ষকদের পদোন্নতির ফাইল পাঠানো হলে অভিযোগের ভিত্তিত্বে সেগুলো একাধিক বার আটকে যায়। পছন্দের ব্যক্তি ছাড়া পদোন্নতির ফাইল আটকে দেয়ায় কলেজটিতে দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তথ্য গোপন করে জ্যেষ্ঠ প্রভাষককে বাদ দিয়ে সহকারী প্রভাষক পদে পদোন্নতির প্রস্তাব প্রেরণ করায় গত ৭এপ্রিল ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে স্বশরীরে হাজির হয়ে তিন কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য জেলা শিক্ষা অফিসার মো: রোস্তুম আলী হেলালী নোটিশ পাঠান। তখন তিনি তরিঘরি করে হাবিবুর রহমান বাদে অন্য জ্যেষ্ঠ প্রভাষকদের  পদোন্নতির প্রস্তাব পাঠান। এর আগে কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হাবিবুর রহমান শিক্ষা ছুটি নিয়ে পিএইচডি করতে গেলে তা সম্পন্ন না হওয়ায় কলেজের অধ্যক্ষ আবুল আছর মোঃ শফিউজ্জামান তাকে শোকজ করেন। হাবিবুর রহমান মালয়েশিয়ার বাইনারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ড্রাগ এডিকশান বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করার চেষ্টার সমুদয় কাগজপত্র দিয়ে জবাব দিলে কলেজ গভনিং বডির সভায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করে তাকে রেহাই দেয়া হয়। এদিকে হামলা ও চাঁদাদাবীর অভিযোগে প্রভাষক হাবিবুর রহমান উপাধ্যক্ষ এস এম রাজিবুল করিম ও কলেজের অর্থনীতির শিক্ষক মাহমুদ হাসান ও রসায়নের আসাদুজ্জামানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে দুটি মামলা দায়ের করেন। ২০২৪ সালের ৫আগস্ট পটপরিবর্তের প্রায় দুইমাস পর ২৬সেপ্টেম্বর জোর করে কলেজের অধ্যক্ষ আবুল আছর মোঃ শফিউজ্জামান কে কলেজ থেকে বের করে তার কক্ষে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন উপাধ্যক্ষ এস এম রাজিবুল করিম। তিনি দায়িত্বে নিয়ে আবার হাবিবুর রহমানকে শিক্ষা ছুটি নিয়ে পিএইচডি করতে না পারায় নতুন করে একটি তদন্ত কমিটি করেন। কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন হাবিবুর রহমানের দায়ের করা মামলায় মারপিট ও চাঁদাদাবীর অভিযোগে অভিযুক্ত সহকর্মী মাহমুদ হাসানের সহধর্মীনি মাহমুদা পারভীনকে। তদন্ত শেষে হাবিবুর রহমানকে ছুটিকালীন সমদুয় বেতন ভাতা ফেরত দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। এক পর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম রাজিবুল করিম বেতন ভাতা ফেরত দেয়ার জন্য প্রভাষক হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। ২০১৮সালে কলেজটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরিক্ষা শাখা অডিট করে। ২০২২ সালের শেষের দিকে কলেজটির অডিট প্রতিবেদন কলেজে পাঠানো হয়। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ ও শিক্ষা পরিদর্শক আব্দুস সালাম স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কলেজটির রসায়ন বিষয়ের প্রভাষক আসাদুজামান, পদার্থের আমিনুল ইসলাম, সমাজকল্যাণের আশরাফুল ইসলাম সিদ্দিকী পরিদর্শন ও নিরীক্ষার সময় তাদের নিবন্ধন সনদ প্রদর্শন করেননি। নিবন্ধন সনদ প্রদর্শন না করলে তারা সরকারি বেতন ভাতা প্রাপ্য হবেন না। এমনকি পদার্থের আমিনুল ইসলাম ও অফিস সহকারী সেলিনা পারভীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষার সময় তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ সমূহও প্রদর্শন করতে পারেননি। কলেজের কম্পিউটার বিষয়ের প্রভাষক আলতাফ হোসেনের কম্পিউটার ডিল্পোমার সনদটি গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তার নিয়োগ বিধি সম্মত হয়নি এবং তার উত্তোলন করা সাড়ে ২২লাখ টাকা বেতন ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। কলেজ কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে একজন শিক্ষক পিএইচপি সম্পন্ন করতে না পারায় তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে বেতন ভাতা ফেরত চাওয়ায় তাদের অভ্যন্তরিন কোন্দলের বিষয়টি পরিস্কারভাবে ফুটে উঠেছে। প্রভাষক হাবিবুর রহমান বলেন, ১৬বছর চাকুরীর বয়স হওয়ার পরও বার বার তাকে বঞ্চিত করে জুনিয়রদের সহকারী অধ্যাপক করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসক ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ঢাকা এবং রাজশাহী আঞ্চলিক অফিসের পরিচালকসহ সকল দপ্তরে আবেদন জানিয়েও পদোন্নতির সভা স্থগীত হলেও চুড়ান্ত কোন প্রতিকার পাননি। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা কলেজের অধ্যক্ষ আবুল আছর মোঃ শফিউজ্জামান বলেন, মব সৃষ্টি করে ২০২৪সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাকে উপাধ্যক্ষসহ অন্যরা কলেজ থেকে বের করে দেন। বের করে দিয়ে তাকে দুই দফায় আট মাস বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়। ছুটির মধ্যেই আবার তিনটি ভুঁয়া শোকজ দেখিয়ে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনটি শোকজ দেখানো হলেও তাকে কোন শোকজের নোটিশ দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, কোন অধ্যক্ষ বেতন ভাতা ভেরত দেয়ার জন্য কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন না। তিনি শিক্ষা অধিদপ্তরকে বিষয়টি অবগত করতে পারেন। পিএইচডি সম্পন্ন করতে না পারলে তাকে বেতন ভাতা ফেরত দিতে হবে এক কোন নিয়ম নেই বলেও তিনি দাবী করেন। গত সপ্তাহে বর্তমান ছাত্রদের অনুরোধে তিনি (অধ্যক্ষ) কলেজে গেলেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তার অনুসারীরা তাকে তার কক্ষে প্রবেশ করতে দেয়নি। 

বুধবার বিকেলে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম রাজিবুল করিম তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি একক কোন সিন্ধান্ত নেননি। কলেজ গভনিং বডি মিটিং করে সকল সিন্ধান্ত নিয়েছে। মামলায় অভিযুক্তের স্ত্রীকে তদন্ত কমিটির আহবায়ক করার বিষয়টি বে-খেয়ালে হয়ে গেছে বলে তিনি জানান। এদিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম রাজিবুল করিম তথ্য গোপন করে জ্যেষ্ঠ প্রভাষককে বাদ দিয়ে সহকারী প্রভাষক পদে পদোন্নতির প্রস্তাব প্রেরণ করার বিষয়টি নাটোর জেলা শিক্ষা অফিসার মো: রোস্তুম আলী হেলালী নিশ্চিত করেছেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন