- সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ না হলে রাজপথে বৃহত্তর আন্দোলন
সৌরভ মাহমুদ হারুন, কুমিল্লা : রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে কুমিল্লার রাজপথ। হত্যাকাণ্ডের বিচার, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে কুমিল্লা নগরীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে সম্মিলিত সনাতনী ঐক্য জোট, কুমিল্লা।
শনিবার (২৯ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৪টায় নগরীর কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তারা হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, একটি পরিবারের সদস্যদের এমন মর্মান্তিক পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অন্য কোনো পরিচয় যেন বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
মানববন্ধনে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী পুত্র প্রীয়ম চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী কন্যা আগামী চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, ধর্ম যার যার, কিন্তু নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার সবার। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে হবে—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বেদনা শুধু ওই পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে।
তারা আরও বলেন, রংপুরের চক্রবর্তী পরিবারের হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
কর্মসূচিতে অংশ নেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার ও কুমিল্লা শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক শ্রী শ্যামল কৃষ্ণ সাহা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক কমল চন্দ খোকন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি অচিন্ত্য দাশ টিটু, সহ-সভাপতি দীলিপ কুমার নাগ কানাই, কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি দিলীপ মজুমদার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব সঞ্জিত দেবনাথ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক উত্তম সরকার, কুমিল্লা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক পিংকু চন্দ, সাংগঠনিক সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী তপু, রামনবমী উদযাপন পরিষদ কুমিল্লার সভাপতি কিশোর দাস, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশীষ দাস এবং বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দে প্রমুখ।
এছাড়াও কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ কুমিল্লা জেলা শাখার সমন্বয়ক আব্দুর রাজ্জাক এবং সিপিবি নেতা শেখ আঃ মান্নান।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মধুসূদন বিশ্বাস।
মানববন্ধনে বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও চক্রবর্তী পরিবারের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা না হলে রাজপথে আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তারা বলেন, নিরাপদে বেঁচে থাকা কোনো সম্প্রদায়ের দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকার।
মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিলটি পূবালী চত্বর থেকে বের হয়ে মনোহরপুর ও রাজগঞ্জ হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় পূবালী চত্বরে এসে শেষ হয়। মিছিলজুড়ে হত্যাকাণ্ডের বিচার, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
এ সময় প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে কুমিল্লার রাজপথ। বক্তারা স্পষ্ট বার্তা দেন—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের মূল ভিত্তি।
