![]() |
| ছবি : সংগৃহীত |
- শ্রমিকদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক : নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাসে দেশের শিল্প খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এ সময়ে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলে অন্তত ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সরকারের গত ছয় মাসে নেওয়া মোট ৩৬২টি পদক্ষেপ পর্যালোচনা করে অর্থনীতির ৯টি খাতের ওপর একটি ‘স্কোরকার্ড’ উপস্থাপন করে সিপিডি। এতে বিভিন্ন উদ্যোগকে ‘স্বস্তি’ ও ‘অস্বস্তি’—দুই ভাগে মূল্যায়ন করা হয়।
শিল্প ও বাণিজ্য খাতকে অন্যতম উদ্বেগের জায়গা হিসেবে উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, গত ছয় মাসে প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অন্তত ৯৫টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে দেশের সার কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে সিপিডি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ এবং একটি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত রপ্তানি নির্ভরতার মতো দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্লথগতি ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুদ্ধাবস্থার মতো আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা।
তার ভাষ্য, এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরও আগের অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক ভিত্তি-দলিল তৈরি করেনি। তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান ছাড়া শুধু ‘সময় লাগবে’ বলা কাঙ্ক্ষিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আর্থিক ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিপিডি। ২০২৬ সালের ফাইন্যান্স অ্যাক্টে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো এবং ই-রিটার্ন ব্যবস্থার সম্প্রসারণকে প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে ‘ব্যয় সংকোচন কমিশন’ গঠন না করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
দেশের ঋণ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার আগে বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা জরুরি ছিল। তা না হলে ভবিষ্যতে এই ঋণের বোঝা পরিশোধে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক রেজল্যুশন অ্যাক্টের আওতায় পাঁচটি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছে সিপিডি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন এবং শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরকে বিদায়ের প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা করেন ড. দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, একজন সাবেক গভর্নরকে যেভাবে বিদায় দেওয়া হয়েছে, তা মেধা ও পেশাদারিত্বের প্রতি অসম্মানজনক।
সুশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বাতিল এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিপিডি। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় উচ্চপদে পদায়ন, মব ভায়োলেন্স এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সংলাপে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে এখনই সমন্বিত ও কাঠামোগত সংস্কারে যেতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
