- মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’, তবু নেতার ভাইকে ঘিরে প্রশ্ন
- ‘প্রভাবশালী হলেও ছাড় নয়’—পুলিশ
সৌরভ মাহমুদ হারুন, বুড়িচং (কুমিল্লা) : কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ দুইজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আটক দুজনের মধ্যে নবী নেওয়াজ (৪৮) ভারেল্লা দক্ষিণ ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. বিল্লাল হোসেন সেন্টুর আপন ভাই বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাতে বুড়িচং থানার দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভারেল্লা দক্ষিণ ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. বিল্লাল হোসেন সেন্টুর বাড়িতে অভিযান চালান। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ফাঁড়ির এসআই মঞ্জুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এসআই মো. ফরহাদ মিয়া, এসআই মো. রফিকসহ পুলিশের একটি দল।
পুলিশের ভাষ্য, বাড়িতে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে নবী নেওয়াজ পালানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ তাকে আটক করতে গেলে তিনি ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন পুলিশের ওপর হামলা চালান। এতে পুলিশ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান আহত হন।
পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে নবী নেওয়াজ ও মাহাবুবুর রহমান (৪০) নামে দুজনকে আটক করে। পুলিশের দাবি, তাদের কাছ থেকে ২৫ পিস ইয়াবা ও ১২০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মাদকদ্রব্য সরিয়ে ফেলারও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সুরেজিত বড়ুয়া জানান, আটক নবী নেওয়াজ ভারেল্লা দক্ষিণ ইউনিয়নের মৃত আলতাফ আলীর ছেলে এবং মাহাবুবুর রহমান একই এলাকার মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে।
কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই রাজনৈতিকভাবে পরিচিত একটি পরিবারের সদস্য মাদকসহ আটক হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারেল্লা দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফরিদ খান মেম্বার বলেন, “কুমিল্লা-৫ আসনের এমপি হাজী মো. জসিম উদ্দিন মাদকমুক্ত বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মাদকের বিরুদ্ধে তিনি নিজেই মাঠে থেকে প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতার আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক পরিচয় কারও অপরাধের ঢাল হতে পারে না। মাদকের বিরুদ্ধে এমপি ও প্রশাসনের উদ্যোগকে সফল করতে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।”
স্থানীয় বিএনপির কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, ভারেল্লা দক্ষিণ ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. বিল্লাল হোসেন সেন্টুর সহযোগিতা ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তাঁর ভাই নবী নেওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।
তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এ বিষয়ে যুবদল নেতা বিল্লাল হোসেন সেন্টুর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
অভিযান পরিচালনাকারী এসআই মঞ্জুর রহমান বলেন, “বিল্লাল হোসেন সেন্টুর সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তাঁর ভাইয়ের মাদক ব্যবসার বিষয়ে তিনি কখনো পুলিশকে অবহিত করেননি বা সহযোগিতা চাননি। অভিযানকালে নবী নেওয়াজকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ সময় পুলিশ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান আহত হন।”
দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সুরেজিত বড়ুয়া বলেন, “রোববার সন্ধ্যার পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা ও গাঁজাসহ দুইজনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হন। তাকে ময়নামতি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক, আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় রোববার রাতে থানায় মামলা হয়েছে। সোমবার সকালে আটক আসামিদের কুমিল্লা আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।”
মাদকের ভয়াল বিস্তার ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই এ অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, মাদক ব্যবসার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
