বিচারকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা সচিবদের সমতা, মাসদার হোসেন মামলার রায় এবং বিদ্যমান বৈষম্য নিরসনের দাবি


মোস্তফা কামাল : আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মূল চালিকাশক্তি হলো একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগ। বিচারালয় হলো ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। জনগণের এই কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে বিচারকগণের আর্থিক নিরাপত্তা ও উন্নততর জীবনযাপন অত্যন্ত জরুরি। তবে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও জটিলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ঐতিহাসিক ‘মাসদার হোসেন মামলার রায়, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনায় জুডিসিয়াল সার্ভিসের জন্য দাবীকৃত সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত যৌক্তিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০০৯ সালের বিচারকদের বেতন স্কেল ২০০৫ সালের বেতন স্কেলের আদেশ অনুসারে নির্ধারিত হলেও সিভিল সার্ভিসের তুলনায় বিচারকদের বেতন কাঠামোয় সবসময় একধরনের ব্যবধান রাখা হয়েছে। ২০১৩ সালে আপিল বিভাগের নির্দেশনায়

জেলা জজদের প্রথম গ্রেডের স্কেল এবং সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজদের জন্য ৪০ হাজার টাকা (স্থির) নির্ধারণ করা হয়। তবে ২০১২ “সিনিয়র সচিব” পদ সৃষ্টি হওয়ায় জেলা ও দায়রা জজরা জাতীয় বেতন কাঠামোতে সচিবদের তুলনায় দুই ধাপ নিচে থেকে যান।

পরবর্তীতে ২০১৬ সালের নতুন বেতন কাঠামোতেও জেলা ও দায়রা জজদের বেতন সচিব, সিনিয়র সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের তুলনায় নিচে রাখা হয়। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং জুডিসিয়াল সার্ভিস পে কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশে জেলা ও দায়রা জজদের প্রাপ্য সুবিধাদি সরকারের সচিবদের সমপর্যায়ে নির্ধারণের জোরালো সুপারিশ করা হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিচারকদের কাজের প্রকৃতি ও মর্যাদা নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন নির্ধারণ করা সমীচীন নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

২০০৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস পে কমিশন শতভাগ জুডিসিয়াল ভাতা প্রদানের সুপারিশ করলেও বর্তমানে তা কেবল ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ৬ নং দফায় বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পে কমিশনের রিপোর্ট অনুসরণে পে স্কেল ও সুবিধাদি নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনও বিচারকদের জন্য জুডিসিয়াল ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে মর্মে জানা গেছে।

ডাক্তার, ইঞ্ছিনিয়ার বা অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো বিচারকদের বিশেষায়িত জ্ঞান দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার সুযোগ নেই। তাছাড়া প্রশাসনের কর্মকর্তা বা অন্যান্য ক্যাডারের মতো বিভিন্ন মিটিং, সেমিনার বা প্রকল্পের সম্মানি কিংবা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ বিচারকদের জন্য নিষিদ্ধ। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিচারকদের বাণিজ্যিক কোচিংসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে পদমর্যাদা ও পেশাগত রক্ষণশীলতা বজায় রেখে আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে জুডিসিয়াল ভাতা বৃদ্ধি সময়ের দাবি।

পরিবহন সুবিধা: অধস্তন আদালতের বিচারকদের যাতায়াতে জেলা পর্যায়ে একটি বা দুটি মাইক্রোবাস যৌথভাবে ব্যবহার করতে হয়, যা ৮ থেকে ১৫ জন বিচারকের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রত্যন্ত চৌকি আদালতের বিচারকদের জন্য কোনো গাড়ি সুবিধা নেই বললেই চলে। অথচ প্রশাসন ও পুলিশের মাঠপর্যায়ের প্রায় সব কর্মকর্তার জন্য সার্বক্ষণিক গাড়ি সুবিধা রয়েছে।

ডোমেস্টিক এইড অ্যালাউন্স ও কুক-সিকিউরিটি ভাতা: সচিব ও অন্যান্য প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ডোমেস্টিক এইড অ্যালাউন্স এবং ৩২ হাজার টাকা পর্যন্ত কুক ও সিকিউরিটি ভাতা পেলেও বিচার বিভাগীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারী জেলা ও দায়রা জজগণ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

অন্যান্য ভাতা: লাইব্রেরি ভাতা, মোবাইল ও মোবাইল ক্রয় ভাতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব ভাতা, ফার্নিচার ভাতা, বিদ্যুৎ ও পানি বিল ভাতা এবং উচ্চ শিক্ষা অর্জনে প্রণোদনার ক্ষেত্রেও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বিচারকরা পিছিয়ে রয়েছেন। 

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিচারকদের জন্য আলাদা ও আকর্ষণীয় বেতন স্কেল, হোম লাইব্রেরি সুবিধা, নিয়মিত হ্যান্ডসেট পরিবর্তন এবং ইউটিলিটি সুবিধা চালু রয়েছে। পাকিস্তানের বিচারকদের জুডিসিয়াল ভাতা মূল বেতনের ১.৫ গুণে উন্নীত করা হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যরা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা ভোগ করেন। অথচ অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ও পে কমিশনের সুপারিশগুলোর আলোকে জেলা জজদের পদমর্যাদা সচিবদের সমকক্ষে উন্নীত করা, জুডিসিয়াল ভাতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা দ্রুত বাস্তবাায়নের দাবি জানিয়েছেন বিচার বিভাগীয় সংশ্লিষ্টরা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন