মসজিদে গিয়ে মানুষের কথা শুনছেন ইউএনও, কমছে প্রশাসন-জনতার দূরত্ব


আব্দুল মজিদ, নাটোর :প্রশাসন শুধু দাপ্তরিক কার্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়াই একজন কর্মকর্তার প্রকৃত দায়িত্ব। সেই ভাবনা থেকেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুল ইসলাম। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মসজিদে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছেন তিনি। নামাজ আদায়ের পাশাপাশি সামাজিক নানা বিষয়ে সচেতনতামূলক বক্তব্য দিচ্ছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বাগাতিপাড়ার তমালতলা মোড় মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন ইউএনও মো. শামসুল ইসলাম। নামাজের আগে বক্তব্যে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে চলতে পারলে ইহকালে শান্তি এবং পরকালে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কীভাবে চলাফেরা করছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।

পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ইসলামে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বহু হাদিস রয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন। তাই নিজেদের পাশাপাশি বাড়ির আশপাশও পরিষ্কার রাখতে হবে। কোনোভাবেই বাড়ির আশপাশে ময়লা-আবর্জনা জমিয়ে রাখা যাবে না। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জুমার নামাজ শেষে ইউএনও মো. শামসুল ইসলাম বলেন, বাগাতিপাড়া উপজেলায় যোগদানের প্রায় দুই মাস হয়েছে তাঁর। এরই মধ্যে তিনি উপজেলার প্রায় ছয়টি মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন। পর্যায়ক্রমে উপজেলার প্রায় সব এলাকার মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগ বৃদ্ধি করতেই তাঁর এ উদ্যোগ। সরকারি সব দপ্তরের সেবা যেন সাধারণ মানুষ নির্দ্বিধায় পেতে পারেন, সেটিই তাঁর লক্ষ্য। উপজেলার কোনো দপ্তর থেকে কোনো নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হলে সেটিকে নিজের ব্যর্থতা বলে মনে করেন তিনি। জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন বলেও আশ্বাস দেন।

এ সময় মাদক নিয়ন্ত্রণ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ইউএনও। মাদক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে মসজিদসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আলোচনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার মাদক ও বাল্যবিবাহ বন্ধে আইন প্রয়োগের বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। তাই সামাজিক সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। আসুন, আমরা সবাই মাদক ও বাল্যবিবাহকে না বলি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম সদু বলেন, “সত্যিই বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন মানবিক ও ব্যতিক্রমী মানুষ। উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হয়েও তিনি দাপ্তরিক দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে আসছেন, তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। এমন উদ্যোগ সচরাচর চোখে পড়ে না। আমার বয়স প্রায় ৭০ বছর। জীবনের দীর্ঘ সময়ে অনেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দেখেছি, কিন্তু মসজিদে মসজিদে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাদের কথা শোনা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়ার এমন উদ্যোগ আগে দেখিনি। এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব কমবে এবং মানুষ প্রশাসনের প্রতি আরও আস্থাশীল হবে। আমি মনে করি, একজন সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে এমন মানবিকতা ও জনসম্পৃক্ততার মানসিকতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান ইউএনও সত্যিই একজন ভালো মনের মানুষ। তাঁর এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

মসজিদে মসজিদে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশা জানার এ উদ্যোগকে প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমানোর একটি ইতিবাচক প্রয়াস হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন