বিশেষ প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর মৌজার জমি হস্তান্তর এবং সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের সাম্প্রতিক বদলিকে ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বিপরীতে আইনি বাধ্যবাধকতা ও সরকারি নথিপত্রের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তব তথ্যচিত্র পাওয়া গেছে। সম্প্রতি দেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বদলির আদেশ হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে মাত্র একদিনেই র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার মোস্ট ওয়ান্টেড পলাতক আসামি ও সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. ইয়াসিনের শতকোটি টাকার খাসজমি গোপনে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। তবে সরকারি বালাম বইয়ের রেকর্ড, ভূমি রাজস্ব নথি এবং বিদ্যমান রেজিস্ট্রেশন আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই অভিযোগগুলোর সঙ্গে বাস্তব নথিপত্রের মৌলিক অমিল রয়েছে। বালাম বইয়ের রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমে যেভাবে বদলির আদেশের দিন বা দায়িত্ব হস্তান্তরের শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে একদিনেই সব দলিল সম্পন্ন করার দাবি করা হয়েছে, তা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। সরকারি নথিমতে, বিতর্কিত এসব দলিলের একটি বড় অংশ অর্থাৎ ৪৮১৮ নম্বর থেকে ৪৮৮২ নম্বর দলিল পর্যন্ত মোট ৬৫টি দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয় গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে। এর পরবর্তীতে ৫১২৫ নম্বর থেকে ৫১৩৩ নম্বর দলিল পর্যন্ত রেজিস্ট্রি কার্যক্রম সম্পন্ন হয় ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে। অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বদলি আদেশ জারির বহু আগেই সরকারি নির্ধারিত কার্যপদ্ধতিতে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে এই রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমগুলো সম্পাদিত হয়েছিল। অন্যদিকে জমিগুলোকে শতকোটি টাকার সরকারি খাসজমি বলে প্রচার করা হলেও ভূমি আইন অনুযায়ী খাস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির শ্রেণি নির্ধারণের এখতিয়ার সাব-রেজিস্ট্রারের নয়, বরং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর আওতাধীন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের। রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমে দাখিলকৃত প্রতিটি দলিলের বিপরীতেই সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কর্তৃক অনুমোদিত নামজারি খতিয়ান বিদ্যমান ছিল এবং সহকারী কমিশনারের অধীনস্থ ভূমি অফিস কর্তৃক গৃহীত হাল সন অবধি অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের বৈধ দাখিলা সংযুক্ত ছিল। ভূমি অফিস যেখানে নিয়মিত সরকারি খাজনা গ্রহণ করে জমি হস্তান্তরযোগ্য হিসেবে প্রত্যয়ন করেছে, সেখানে রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তার নিজ উদ্যোগে জমিকে খাস হিসেবে ঘোষণা করার কোনো আইনি সুযোগ থাকে না।
পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন সশরীরে অফিসে উপস্থিত হয়ে জমি রেজিস্ট্রি করেছেন কি না—গণমাধ্যমের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানা গেছে, ক্রেতাগণের পক্ষ থেকে নিয়োজিত আইনজীবীর মাধ্যমে দাখিলকৃত আইনি আবেদনের প্রেক্ষিতে সাব-রেজিস্ট্রার বিধি মোতাবেক কমিশন ইস্যু করে দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেন।
এ বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেন, রেজিস্ট্রেশন একটি তাৎক্ষণিক নাগরিক সেবা। রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এবং নিবন্ধন বিধিমালা ২০১৪ অনুযায়ী, পক্ষগণ কর্তৃক দাখিলকৃত কাগজপত্রে বৈধ নামজারি ও ভূমি অফিসের হাল সন অবধি অনলাইন খাজনা রশিদ আপডেট থাকলে উপযুক্ত কোনো কারণ বা আদালতের সুনির্দিষ্ট সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ব্যতিরেকে দলিল নিবন্ধন করে দিতে সাব-রেজিস্ট্রার আইনত বাধ্য। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দাতা ইয়াসিন সশরীরে কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় ক্রেতা ও আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কমিশন নিয়োগের মাধ্যমে সম্পাদন নিশ্চিত করা হয়। জঙ্গল সলিমপুরের ওই দাগের জমি নিয়ে সরকারের কোনো বিশেষ সংস্থা বা আদালতের কোনো প্রকার স্থগিতাদেশ সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে কখনোই প্রেরণ করা হয়নি। ফলে সব আইনি শর্ত পূরণ থাকায় দলিলগুলো নিবন্ধিত হয়েছে, বদলির আদেশের সঙ্গে এটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে জঙ্গল সলিমপুর মৌজার জটিলতা অনুধাবন করে সাব-রেজিস্ট্রারগণ জেলা রেজিস্ট্রারের মাসিক সমন্বয় সভায় স্বপ্রণোদিত হয়ে জঙ্গল সলিমপুরের রেজিস্ট্রেশন বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা চেয়েছিলেন। বিষয়টি নিবন্ধন অধিদপ্তরের নজরে আনা হলে অধিদপ্তর থেকেও সুনির্দিষ্ট আইনি বিধিবিধান অনুসরণ এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলে সে ব্যাপারে সজাগ থাকার সাধারণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা স্থানীয় থানা থেকে ইয়াসিনের জমি হস্তান্তরের ওপর কোনো আপত্তি বা লিখিত নির্দেশনা সাব-রেজিস্ট্রারকে কখনো দেওয়া হয়নি। এমনকি জেলা বা উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাসমূহেও জমি হস্তান্তর বন্ধে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একাধিক মামলার পলাতক আসামি ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন যাতে জমি বিক্রি করতে না পারেন, সেজন্য সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল উপযুক্ত আদালত থেকে সুনির্দিষ্ট আদেশ জারি করানো। আদালতের সেই আদেশে ইয়াসিনের জমির ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ বন্ধ, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং জমি হস্তান্তরে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠানো যেত। প্রশাসন আদালত থেকে সে ধরনের কোনো আইনি স্থগিতাদেশ না এনে কেবল প্রচলিত আইন মেনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তার ওপর দায় চাপানো পুরোপুরি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও দায় এড়ানোর প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
