মালিকুজ্জামান কাকা, শার্শা (যশোর) :
কুল, ক্রেতা ও বিক্রেতা মিলে এখন বেলতলা বাজারে বেজায় জনসমাগম। প্রতি শীতে বেলতলা বাজার গ্রীষ্মের তুলনায় নতুন রূপ নেয়। কুয়াশা ভেজা সাত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কুলের ঘ্রাণ আর কেনাবেচার ব্যস্ততায় মুখর থাকে পুরো বাজার।
একসময় সীমিত পরিসরে থাকা কুল চাষ এখন শার্শার কৃষি অর্থনীতির ভরসা। যশোরের শার্শা উপজেলার শেষ পূর্ব এলাকায় বাজারটি অবস্থিত।
শার্শা ও পাশের কলারোয়া উপজেলার কুল বাগান ঘিরে বেলতলা বাজার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফল সরবরাহের একটি নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আগে শার্শা উপজেলার মাঠ গুলোতে কুল চাষ ছিল সীমিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কুলই এখন এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম ভরসা। লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছর নতুন কৃষক এই কুল চাষে যুক্ত হচ্ছেন। আর বৃদ্ধি পাচ্ছে বেলতলা বাজারের বাণিজ্য আয়তন।
স্থানীয় কুল চাষি আকসাদ আলী জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ২ বিঘা জমিতে কুল আবাদ করেছেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন কিছু কম হলেও বাজারে দাম ভালো। বেলতলা বাজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানে সঠিক ওজন পাওয়া যায়, কোনো কারচুপি নেই। এতে আমাদের মতো চাষিরা প্রকৃত অর্থে লাভবান হতে পারছি।
প্রতিদিন বাজারে উঠছে বিভিন্ন জাতের কুল। বৌ সুন্দরী, বল সুন্দরী, থাই, চায়না, আপেল ও টক কুল এখানে আছে। জাতভেদে দামে তারতম্য থাকলেও সব ধরনের কুলই দ্রুত বিক্রি হচ্ছে।
কুল ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বড় বড় শহরে কুলের চাহিদা থাকায় এখান থেকে প্রতিদিন ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে কুল পাঠানো হচ্ছে।
ঝিনাইদহের ফল ব্যবসায়ী মুজাহিদ মিয়া বলেন, আমি প্রায় ১৭ বছর ফল ব্যবসায় জড়িত। প্রতি বছর শীত মৌসুমে বেলতলা বাজারে আসি। এ বছর কিছু এলাকায় ফলন কম হলেও বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় কুলের দাম ভালো। তুলনামূলক বেশি দামে কিনেও আমরা অন্য বাজারে ভালো দামে বিক্রি করতে পারছি। তাই বেলতলা বাজার আমাদের জন্য নির্ভরযোগ্য মোকাম।
বাজারের স্থানীয় আড়তদার সজীব, সালাউদ্দীন মুকুল, মিনারুল, কামাল, ইয়াসিন ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর কুলের চাহিদা ও কেনাবেচা দুটোই বেড়েছে আমাদের বাজারে সঠিক ওজনে ও ন্যায্য দামে কুল বিক্রি হয়। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত টানা কেনাবেচা চলে। দাম ভালো থাকায় চাষি ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষ খুশি।
বেলতলা বাজার ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মুন্না বলেন, কুল ঘিরে এই বাজারের সম্ভাবনা ব্যাপক। চাষি ও ব্যবসায়ীরা যেন নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন, সে জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন। কুল চাষ যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে বেলতলা বাজার দক্ষিণাঞ্চলে আমের বাজারের মতো কুল বাজার হিসেবে পরিচিতি পাবে।
এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা কৃষি অফিসার দীপক কুমার সাহা জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ১৩৮ হেক্টর বা ১০৩০ বিঘা জমিতে কুল চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, বৌ সুন্দরী, বল সুন্দরী, থাই, আপেল, চায়না, নারকেল কুল ও টক কুলের চাষ বেশি হয়েছে। ফলন ও বাজার মূল্য ভালো তাই চাষিরা লাভবান। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে কুল চাষ আরও বাড়বে।
শীতের এই সময়ে বেলতলা বাজার তাই শুধু একটি ফলের বাজার নয় এটি শার্শা উপজেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। কুলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক গতিশীলতা গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন মাত্রা এনেছে । মাঠের কুল এখন শার্শার কৃষকের অর্থ আর খুশি। এই কুল বাজার দেশের চাহিদা মিটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় প্রত্যয়ী নতুন ভবিষ্যতে।
