ঘুষের টাকা ফিরিয়ে দিতে গিয়ে অবরুদ্ধ পুলিশের এএসআই
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্রজনতা হত্যা মামলায় গ্রেফতারের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়া ও নিজের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে চাপ প্রয়োগ করার অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সাবেক ও বর্তমানে ফতুল্লা থানায় কর্মরত এএসআই জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
ঘুষের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বেকায়দায় পড়েন সেই বিতর্কিত পুলিশের এএসআই। পরবর্তীতে উক্ত বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ভুক্তভোগীর কাছ থেকে গ্রহণকৃত ঘুষের অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেয়ার প্রমানও পাওয়া গেছে।
তারই ধারাবাহিকতায় পূর্ব নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী গত সোমবার দুপুরে পুলিশ কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন চৌধুরীবাড়ী বাজার এলাকায় ভুক্তভোগীর সেই টাকার একটি অংশ ফেরত দিতে এসে ভুক্তভোগীর দায়ের করা অভিযোগের বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে চাপ প্রয়োগ করতে থাকলে, স্থানীয় লোকজনের চোখে ধরা পরলে তারা (এএসআই) জহিরুল ইসলামকে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
পরবর্তীতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের হস্তক্ষেপে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অবরুদ্ধ হওয়া (এএসআই) জহিরুল ইসলাম বর্তমানে ফতুল্লা মডেল থানায় কর্মরত রয়েছেন। তিনি ইতিপূর্বে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় কর্মরত থাকাকালীন ঘুষ আদায় করেছেন বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানাযায় এএসআই জহিরুল ইসলাম সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় কর্মরত থাকাকালীন ভুক্তভোগী ইসহাক মিয়াকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে নগদ ১ লাখ টাকা এবং ৩২ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল ফোন ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেন।
ভুক্তভোগী ইছহাক মিয়া উক্ত বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের (হেডকোয়াটারে) একটি অভিযোগ দায়ের করলে, পরবর্তীতে সেই অভিযোগ ফিরিয়ে নিতে তিনি ভুক্তভোগীকে টাকা ফেরত দেয়ার চুক্তি করেন এবং একটি মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।
ভুক্তভোগী ইসহাক মিয়ার ছেলে মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, ৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে পুলিশ কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আমাদের বাসায় এসে আমার বাবাকে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী ও নেতা আখ্যা দিয়ে বৈষম্য বিরোধী ছাত্রজনতা হত্যার পাঁচ-ছয়টি মামলার দেয়ার ভয় দেখিয়ে আমার বাবাকে জিম্মি করেন এবং তিনি আমাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সঙ্গে আমার বাবার থাকা ছবিকে পুঁজি করে তাৎক্ষণিক গ্রেফতারার ভয়ভীতি প্রদর্শন করে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করেন।
আমরা কোনো প্রকার উপায় না-পেয়ে মামলার ভয়ে নিরুপায় হয়ে অনেক দর-কষাকষির মাধ্যমে তাকে নগদ ১ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হই।
১ লক্ষ টাকা নেওয়ার একপর্যায়ে তিনি একটি মোবাইল ফোনও দাবি করেন এবং তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তাকে ৩২ হাজার টাকায় একটি মোবাইল ফোন কিনে দিতে বাধ্য করেন।
সাইফুল আরোও বলেন, উক্ত টাকা ও মোবাইল নেয়ার পরেও তিনি আরোও টাকার জন্য আমাদেরকে চাপ প্রয়োগ করলে আমরা পুলিশ সদর দপ্তরের হেডকোয়ার্টারে একটি অভিযোগ দায়ের করি। সেখান থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং আমরা তাদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপন করি।
পরবর্তীতে এএসআই জহিরুল ইসলাম আমাদের সঙ্গে কয়েক দফায় দেখা করে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে এবং তিনি দুই দফায় আমাদেরকে ৯০ হাজার টাকা ফেরত দেয়ার একপর্যায়ে হঠাৎ সোমবার এসে বাকি টাকা ফেরত দেয়া সহ প্রয়োজনে বাড়তি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন এবং আমাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি মিথ্যা বলে উপস্থাপন করার প্রস্তাব করেন।
তার এমন প্রস্তাবকে আমরা প্রত্যাখ্যান করলে আমাদের ওপর চড়াও হয়ে হুমকি/ধামকি দিতে থাকেন একপর্যায়ে এলাকার স্থানীয় বিষয়টি টের পেয়ে আমাদের বাড়িতে জড়ো হয়ে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে তাকে অবরুদ্ধ করেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এএসআই জহিরুল ইসলামকে একাধিকবার তার মুঠোফোনে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
উক্ত বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল বারিক বলেন, ঘুষের বিষয়টি আমার জানা নেই। গতকাল ফতুল্লার এক এএসআইয়ের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঝামেলা হলে আমাদের থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুম বিল্লাহ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উভয়ের সঙ্গে বসে ওই কর্মকর্তাকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। জহিরুল ইসলাম সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় থাকা অবস্থায় আমি ছিলাম না এবং ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গ সার্কেল) মেহেদী ইসলাম বলেন, হেডকোয়ার্টার্ থেকে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব আমার কাছে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে ।
তবে গতকাল অবরুদ্ধের বিষয়টি আমার জানা নেই, হয়তো তিনি ভুক্তভোগী পরিবারকে ম্যানেজ করতে গেছেন।
