ডিলারদের গুদামে সার, তবু চাহিদামতো পাচ্ছেন না কৃষক

 নাটোরে সারের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ


আব্দুল মজিদ, নাটোর : নাটোরের বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকদের মধ্যে সারের কৃত্রিম সংকট নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসেবে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অনেক কৃষক অতিরিক্ত দামে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি অনুমোদিত কিছু ডিলার গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত রেখেও সরাসরি কৃষকদের কাছে বিক্রি না করে ফড়িয়া ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করছেন। পরে সেই সারই বেশি দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ইউরিয়া সারের বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রির কথা থাকলেও খোলা বাজারে তা ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সরেজমিনে নাটোরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাচ্ছেন না। অনেককে নির্ধারিত চাহিদার অর্ধেক সার নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।

বাগাতিপাড়া উপজেলার কৃষক আবুল হোসেন বলেন, “আমার জমিতে ৩০ কেজি সার দরকার। কিন্তু ডিলার ১০ থেকে ১৫ কেজির বেশি দিচ্ছে না। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে।”

আরেক কৃষক নজরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “ডিলারদের গুদামে সার আছে। কিন্তু কৃষকদের না দিয়ে ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। পরে সেই সারই বেশি দামে বাজারে আসে।”

কৃষক রানা জানান, সরকারি ডিলারদের কাছে সার না পেলেও খোলা বাজারে সহজেই সার পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেখানে কেজিপ্রতি ৭ থেকে ১০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, কিছু ডিলার প্রকাশ্যে সংকটের কথা বললেও আড়ালে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে সার সরবরাহ করছেন।

সাইফুল ইসলাম নামের এক কৃষক বলেন, “এক বিঘা পাট চাষে অন্তত ২০ কেজি সার লাগে। কিন্তু ডিলার দিচ্ছে মাত্র ১০ কেজি। এতে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন হবে।”


কৃষকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত দামে সার কিনতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে চলতি মৌসুমে অনেক কৃষক লোকসানের মুখে পড়তে পারেন।

বাগাতিপাড়া উপজেলার গালিমপুর এলাকার সরকার নির্ধারিত সার ডিলার “সোনালী ট্রেডার্স”-এ গিয়ে গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত দেখা যায়। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, গণমাধ্যম উপস্থিত হওয়ার আগে তাদের চাহিদামতো সার দেওয়া হচ্ছিল না। সাংবাদিকরা সেখানে যাওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।

অভিযোগের বিষয়ে “সোনালী ট্রেডার্স”-এর স্বত্বাধিকারী শ্রী শিব চরণ মোর বলেন, “সারের কোনো ঘাটতি নেই। কৃষকদের অভিযোগ সঠিক নয়।”

বাংলাদেশ সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশন নাটোর জেলা শাখার সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, “এবার পাটের আবাদ বেড়েছে, তাই ইউরিয়া সারের চাহিদাও বেশি। তবে ডিলারদের অনিয়মের সুযোগ নেই। আমরা ডিলার পয়েন্টে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের দাবি জানিয়েছি।”

বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. ভবসিন্ধু বলেন, “সার সংকটের অভিযোগ ভিত্তিহীন। উপজেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। ১৬ জন ডিলারের মাধ্যমে নিয়মিত সার বিক্রি হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি কৃষক সেজে অতিরিক্ত সার কেনার চেষ্টা করছে, বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে।”

তবে কৃষকদের অভিযোগ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে কৃষি বিভাগের বক্তব্যের স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা গেছে। একদিকে কৃষকরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না, অন্যদিকে খোলা বাজারে অতিরিক্ত দামে সহজেই সার মিলছে। এতে ডিলার সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

কৃষকদের দাবি, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করে সরকারি মূল্যে সার বিক্রি কার্যকর করতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন