“শেষ যাত্রার পথও অনিরাপদ: ভাঙনের মুখে নূরপুর মালঞ্চি জনজীবন”


আব্দুল মজিদ : দুই পাশে পুকুরের পানি। মাঝখানে সরু একটি রাস্তা। কোথাও মাটি ধসে গেছে, কোথাও আবার রাস্তার প্রস্থ এতটাই কমে এসেছে যে পাশাপাশি দুজন মানুষের হাঁটাও কঠিন। এই পথ ধরেই প্রতিদিন মাদরাসায় যায় শিক্ষার্থী, ঈদগাহে যান মুসল্লিরা, আর শেষ যাত্রায় কবরস্থানের পথও পাড়ি দেয় গ্রামের মানুষ। নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার নূরপুর মালঞ্চির এই পথ যেন গ্রামীণ জনজীবনের এক নীরব সংগ্রামের প্রতীক।

সরেজমিনে দেখা যায়, কবরস্থান ও মসজিদ সংলগ্ন প্রায় ২০০ মিটার রাস্তা দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের কবলে রয়েছে। রাস্তার দুই পাশেই বড় পুকুর। ভাঙতে ভাঙতে সড়কের অনেকাংশ পুকুরে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে একসময় প্রশস্ত এই পথ এখন অনেক স্থানে মাত্র কয়েক ফুটে সীমাবদ্ধ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি শুধু একটি রাস্তা নয়; বরং কয়েকটি গ্রামের মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। নূরপুর মালঞ্চির পশ্চিমপাড়া, মোল্লাপাড়া ও আশপাশের এলাকার মানুষ এই পথ ব্যবহার করে মাদরাসা, ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদে যাতায়াত করেন।

এক সময়ের নালা ভরাট করে এলাকাবাসীর উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল এই রাস্তা। ধীরে ধীরে এটি এলাকার প্রধান চলাচলের পথ হয়ে ওঠে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুকুরপাড় ভেঙে রাস্তার অস্তিত্বই আজ হুমকির মুখে। কোথাও রাস্তার কিনারা ধসে পড়েছে, কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।


স্থানীয় প্রবীণরা জানান, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয় জানাজা ও দাফনের সময়। কবরস্থানে লাশ নিয়ে যেতে হলে মানুষকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সরু পথ অতিক্রম করতে হয়। এখনতো পাশাপাশি দু/তিন জন হাঁটার সুযোগ নাই। তাই মাত্র ২০০ মিটার রাস্তার এই বেহাল অবস্থার কারণে অনেককে প্রায় ২ কিলোমিটার ঘুরপথ ব্যবহার করতে হয়।

নূরপুর মালঞ্চি এলাকার বাসিন্দা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, বাগাতিপাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি পারভেজ সাজ্জাদ হোসেন সরকার (বাচ্চু) বলেন, “মসজিদের পাশের যে অংশটি ভেঙে পুকুরে চলে গেছে, সেটি দ্রুত সংস্কার না করলে মসজিদটিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত সংস্কারের জোর দাবি জানাচ্ছি। রাস্তার আইডি নম্বর-১৬৯০৯৫২০৪।” 

উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি হায়দার রশীদ সোনা বলেন, “এই সড়কের সঙ্গে ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান ও মাদরাসার যোগাযোগ রয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেন। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

সম্প্রতি সড়কের একাংশে এইচবিবি (ঐইই) করণ কাজের উদ্বোধন উপলক্ষে সরেজমিনে গিয়ে ৩ নম্বর বাগাতিপাড়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ফাহিমা বেগম বলেন, “এখানে না এলে বোঝাই যেত না রাস্তার অবস্থা কতটা খারাপ। এই রাস্তা দিয়েই গ্রামের মানুষ কবরস্থানে লাশ নিয়ে আসে। রাস্তার দুই পাশ এমনভাবে ভেঙে গেছে যে পাশাপাশি দুইজন মানুষও হেঁটে যেতে পারে না। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

বাগাতিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান বলেন, “সড়কটির অবস্থা খুবই নাজুক। মাত্র ২০০ মিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকাবাসীকে প্রায় ২ কিলোমিটার পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এমনকি জানাজা ও দাফনের সময় লাশের খাটিয়া নিয়ে পাশাপাশি হাঁটারও সুযোগ নেই। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

বাগাতিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বাতেন জানান, “নূরপুর পশ্চিমপাড়ার এই রাস্তা একসময় একটি নালা ছিল। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সেটি রাস্তায় রূপান্তরিত হয়। কোথাও ৫০ ফুট, কোথাও ৩০ ফুট প্রশস্ত এই সড়ক দিয়ে নূরপুর মালঞ্চির পশ্চিমপাড়া, মোল্লাপাড়া ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ ঈদগাহ, গোরস্থান ও মাদরাসায় যাতায়াত করেন। কিন্তু বর্তমানে ভাঙনের কারণে অনেক স্থানে রাস্তার প্রস্থ ৫০ ফুট থেকে কমে ৫ ফুটেরও নিচে নেমে এসেছে। তাই দ্রুত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।”

কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাস্তার দুরবস্থার কারণে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে বৃষ্টি মৌসুমে চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা দ্রুত সংস্কার কাজ শুরুর দাবি জানান।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এলাকা পরিদর্শন করেছেন, আশ্বাসও দিয়েছেন; কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন এখনও চোখে পড়েনি।

পুকুরঘেরা সরু পথটি গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে পানির বিস্তৃতি। প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝেও লুকিয়ে আছে মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ।

এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত রাস্তা সংস্কার ও পুকুরপাড়ে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তাদের মতে, এটি শুধু চলাচলের সুবিধার বিষয় নয়; বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কবরস্থান এবং জননিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার প্রশ্ন।

নূরপুর মালঞ্চির মানুষ এখন অপেক্ষা করছেন একটি নিরাপদ রাস্তার জন্য- যে পথে শিশুরা নিশ্চিন্তে মাদরাসায় যাবে, মুসল্লিরা স্বস্তিতে ঈদগাহে পৌঁছাবেন এবং শেষ বিদায়ের পথটুকুও হবে সম্মানজনক ও নিরাপদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন