জমি মাপজোককে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, অস্ত্র উদ্ধার; পরিবার বলছে—‘সবকিছুর নেপথ্যে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন’

 


নওগাঁয় আবারও ছেলেকে মারতে লোক ভাড়া করার অভিযোগ জামাই-শাশুড়ীর বিরুদ্ধে

এ.বি.এম. হাবিবুর রহমান : নওগাঁ শহরের আলোচিত কবিরাজ পরিবারের পারিবারিক বিরোধ যেন কোনোভাবেই থামছে না। একের পর এক মামলা, পাল্টা মামলা, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া, জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি এবং নতুন নতুন অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাগুলো এখন নওগাঁজুড়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, যে বিরোধ পারিবারিকভাবে মীমাংসার পথে এগোচ্ছিল, সেখানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি বারবার জটিল হয়ে উঠছে। তাদের অভিযোগ, পরিবারের জামাইয়ের প্ররোচনায় মা ও ছেলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ানো হচ্ছে এবং পরিকল্পিতভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। সর্বশেষ জমি পরিমাপের দিন ছেলেকে হত্যার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী ভাড়া করে আনার অভিযোগও তুলেছেন তারা।

মামলার নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জুলাই নওগাঁ সদর উপজেলার ভাঙ্গা মসজিদ মোড় এলাকায় কুমুড়িয়া মৌজার ১১৬ নম্বর খতিয়ানের ৯০৮ ও ৯০৯ নম্বর দাগভুক্ত প্রায় ৩ একর ১০ শতক জমি নিরপেক্ষভাবে পরিমাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে মরহুম আমিনুল ইসলাম কবিরাজের একমাত্র ছেলে জুমাতুল ইসলাম সৌরভ, তার দুই বোনের অংশ এবং মা বিলকিস আক্তারের অংশ আইনগতভাবে নির্ধারণের লক্ষ্যে কয়েকজন আইনজীবী, স্থানীয় সার্ভেয়ার, পরিবারের জ্যেষ্ঠ দুই চাচা,ফুফুসহ পরিবারের সদস্য ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মাপজোক চলছিল।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় বিলকিস আক্তার উপস্থিত থাকলেও তিনি মাঝেমধ্যে মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন। আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে আবু রায়হান সনেটসহ ৬ থেকে ৭ জন ঘটনাস্থলে এসে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে সনেট ধারালো অস্ত্র নিয়ে সৌরভের দিকে আক্রমণের চেষ্টা করলে তার চাচা বাধা দেন। উপস্থিত লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র এবং একটি মোটরসাইকেল ফেলে রেখে যায়। পরে নওগাঁ সদর মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সেগুলো জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়।

পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও মামলা গ্রহণে বিলম্ব করা হয়। পরে তাদের আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন। সেই অনুযায়ী গত ২৭ জুলাই নওগাঁর বিজ্ঞ ১ নম্বর আমলি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়েরের আবেদন করা হলেও সেটি আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন তারা। এতে পরিবারটি হতাশা প্রকাশ করেছে।

এদিকে, ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে নওগাঁ সদর হাসপাতালের আরএমও আবুজার গাফ্ফারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের দাবি, তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন এবং পারিবারিক বিরোধে প্রভাব বিস্তার করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জামাই, আরএমও আবুজার গাফ্ফার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোন লোক পাঠান নাই বা তার কোন সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান।

জুমাতুল ইসলাম সৌরভ এর মা বিলকিস আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, এসব লোকজন তার কাছের এবং পরিচিত,কিন্তু তাদেরকে তিনি এখানে আসতে বলেন নাই বা ডাকেনও নাই। তারা নিজেদের থেকে আসতে পারে বলে সকলের সামনেই জানান। কিন্তু এই আবু রায়হান সনেট নওগাঁ সদর থানার চিহ্নত চুরির সহ একাধিক মামলার আসামী,যে মামলা গুলো নওগাঁ কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।

একাধিক নওগাঁ বাসী জানান, নওগাঁ সদর হাঁসপাতালের আরএমও আবুজার গাফ্ফার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে এই একই হাঁসপাতালে বহাল আছে। আওয়ামীলীগ সরকারের সময়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে, এমপি মন্ত্রীর প্রায় সকলের সঙ্গেই  সম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং সে সময় থেকেই রাজনৈতিক পরিচয়ে দাপটের সাথে একই প্রতিষ্ঠানে বহাল থাকেন। বর্তমানে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে খোলস বদলিয়ে বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বর্তমান এমপির সাথেও সু-সম্পর্ক স্থাপন করে একই ভাবে বহালতবিয়তে একই হাসপাতালে রয়ে গেছেন। এতে নওগাঁর জনমনে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া চলছে।

স্থানীয়রা জানান,ইতিপূর্বে বার বার ছেলেকে হত্যা করার উদ্দেশ্য এসব ছেলেদেরকেই সে ও তার জামাই ভাড়া করেছিল। এখন অস্বীকার করছে মাত্র, প্রায়ই সময় সনেটসহ এসব ছেলেদেরকেই তার ও তার জামাই আবুজার গাফ্ফারের আশেপাশে দেখা যায় বলে এলাকাবাসী জানান। তারা জানান,নিজ ছেলেকে সম্পত্তির লোভে এমন নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিলকিস আক্তারের সামনেই প্রতিবাদও করেন উপস্থিত এলাকাবাসী।

দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ বিরোধে ভুক্তভোগী পরিবার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। নওগাঁবাসীর প্রত্যাশা, পারিবারিক বিরোধ যেন আর কোনো সহিংসতার দিকে না গড়ায় এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এর স্থায়ী সমাধান হোক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন