সাংবাদিকদের কল্যাণ ও অধিকার রক্ষায় জাতীয় সাংবাদিক সংস্থাকে শক্তিশালী করার আহ্বান


নিজস্ব প্রতিবেদক : সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সহ-সভাপতি সাংবাদিক মো. আব্দুল মজিদ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বর্ধিত সভায় বক্তব্যকালে তিনি এ আহ্বান জানান।

দীর্ঘ ৪৪ বছরের ঐতিহ্য ও পথচলার এ সংগঠনকে সাংবাদিকদের আস্থা, নিরাপত্তা ও কল্যাণের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বক্তব্যের শুরুতে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত সাংবাদিক মোহাম্মদ আলতাফ হোসেনকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন আব্দুল মজিদ।

তিনি বলেন, আলতাফ হোসেন শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন দেশের অসংখ্য সাংবাদিকের শিক্ষাগুরু, অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক। সাংবাদিকদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাদের কল্যাণে তিনি যে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তা তাঁর আদর্শ ও স্বপ্নের প্রতিফলন।

আব্দুল মজিদ বলেন, “মরহুম আলতাফ হোসেন আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর আদর্শ, কর্ম ও স্মৃতি রয়েছে। তাঁর রেখে যাওয়া জাতীয় সাংবাদিক সংস্থাকে সাংবাদিকদের আস্থা, নিরাপত্তা ও কল্যাণের ঠিকানা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।”

সাংবাদিকদের দুর্দিনে পাশে দাঁড়াতে নিয়মিত মাসিক চাঁদার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।

এই তহবিল থেকে অসুস্থ সাংবাদিকদের চিকিৎসা সহায়তা, দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিকদের জরুরি সহযোগিতা এবং কোনো সাংবাদিক মারা গেলে তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করার কথা বলেন তিনি।

কর্মরত অবস্থায় কোনো সাংবাদিক হামলা, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হলে দ্রুত সহায়তার জন্য পৃথক জরুরি সাংবাদিক সহায়তা তহবিল গঠনের ওপরও গুরুত্ব দেন আব্দুল মজিদ।

তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মামলা, হয়রানি কিংবা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে আইনগত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে আব্দুল মজিদ বলেন, সাংবাদিকদের শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আধুনিক সাংবাদিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের প্রযুক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

এ জন্য ডিজিটাল সাংবাদিকতা, মোবাইল জার্নালিজম, ভিডিও রিপোর্টিং, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই, সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন তিনি।

বিশেষ করে তরুণ সাংবাদিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও পরামর্শমূলক কার্যক্রম চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

কোনো সাংবাদিক মারা গেলে শুধু তাঁর পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা নয়, সন্তানদের শিক্ষার বিষয়টিও সংগঠনকে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান আব্দুল মজিদ।

মেধাবী ও অসচ্ছল সাংবাদিক পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি চালু করা এবং সাংবাদিকদের জন্য বিভিন্ন হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও চিকিৎসকদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

এ ছাড়া সদস্যদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্বল্প খরচে জীবন ও দুর্ঘটনা বীমা চালুর কথাও বলেন তিনি। 

জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার প্রকৃত ও নিয়মিত সদস্যদের জন্য আধুনিক ডিজিটাল সদস্যপদ ও পরিচয়পত্র ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন আব্দুল মজিদ।

একই সঙ্গে সংগঠনের নিজস্ব তথ্য ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে সাংবাদিকতার আইন, নীতিমালা, সরকারি তথ্য, প্রশিক্ষণ উপকরণ ও প্রয়োজনীয় রেফারেন্স সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে সাংবাদিকদের পেশাগত জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ আরও বাড়বে।

তিনি বলেন, “আমরা চাই, সাংবাদিকের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে, অসুস্থতায় এবং সংকটে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা পাশে থাকবে। একজন সাংবাদিক শুধু পরিচয় পাবেন না, পাবেন সম্মান, সহযোগিতা, নিরাপত্তা ও সহমর্মিতা।”

সভায় জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার মহাসচিব মোহাম্মদ আলমগীর গনি সাংবাদিকতার পেশাগত মান, বস্তুনিষ্ঠতা, সততা ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, আইন ও নৈতিকতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সাংবাদিকদের দক্ষ হতে হবে।

তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায্য দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, মহানগর ও বিভাগীয় কমিটিকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সক্রিয় করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বর্ধিত সভায় জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করা, বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, মহানগর ও বিভাগীয় কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় নীতি নির্ধারণী পরিষদের সভাপতি মো. জামাল হোসেন, সদস্য সচিব মোহাম্মদ মনজুর হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান মোল্লা, সহসভাপতি আতিকুর রহমান আজাদ, মো. খাইরুল ইসলাম,  ও । এছাড়াও  মোহাম্মদ রাব্বি মোল্লা সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ঙছিলেন।

জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি মোসাঃ আসিয়া আক্তার সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন। এছাড়া সহসভাপতি মো. মনজুরুল হক, শিহাব উদ্দিন আহমেদ টিপু ও সিকদার আরিফুল আলম টিটো উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংস্থার যুগ্ম মহাসচিব মো. মামুনুর রশিদ ও সহ-সভাপতি এম আর প্রীন্স । এ সময় যুগ্ম মহাসচিব এম এ আকাশ ও মো. আনোয়ারুল হক, সহকারী মহাসচিব মো. নাজির হোসেন ও প্রিয়াঙ্কা ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মহানগর কমিটির সভাপতি এম. হোসাইন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক শেখ মনিরুল ইসলাম, দপ্তর সম্পাদক নূরনবী সোহেল, ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন উদ্দিন, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন রাজ, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম এবং সাংগঠনিক সচিব মোহাম্মদ মেহেদী হাসানসহ বিভিন্ন জেলা, মহানগর ও বিভাগীয় কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা।

এ ছাড়া সভায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন জাতীয় নির্বাহী পর্ষদের সদস্য ও পটুয়াখালী জেলা শাখার সভাপতি সাংবাদিক আলহাজ্ব ফিরোজ আহমেদ এবং সহসাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম কামরুল।

প্রায় দুই শতাধিক সাংবাদিকের অংশগ্রহণ

দিনব্যাপী এ বর্ধিত সভায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রায় দুই শতাধিক সিনিয়র সাংবাদিক ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। সাংগঠনিক আলোচনার পাশাপাশি সভাটি সাংবাদিকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সভায় আগামী দিনের সাংগঠনিক কর্মপরিকল্পনা, জেলা-উপজেলা ও মহানগর কমিটির কার্যক্রম গতিশীল করা, সংগঠন সম্প্রসারণ, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা এবং জাতীয় সাংবাদিক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব উঠে আসে।

দীর্ঘ ৪৪ বছরের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে সভা থেকে নেতৃবৃন্দ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন—সাংবাদিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা, পেশাদারিত্বের বিকাশ, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা এবং একটি শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সংগঠন গড়ে তুলতে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ভবিষ্যতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন