নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা অর্থকরী ফসল পান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত এই কৃষিপণ্যের চাহিদা শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই খাতেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কথিত সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। এতে একদিকে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পানচাষিরা, অন্যদিকে রপ্তানির সুযোগ সংকুচিত হয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বৈধ রপ্তানিকারকরাও।
চাষিদের অভিযোগ, পান রপ্তানি ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করছে। উৎপাদনস্থল থেকে পান সংগ্রহ, বাজারজাতকরণ এবং রপ্তানি পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে তাদের নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রকৃত চাষিরা অনেক সময় উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে বৈধ রপ্তানিকারকরাও স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাষিদের ভাষ্য, পান উৎপাদনে শ্রম, সার, সেচ, বাঁশ ও অন্যান্য উপকরণে ব্যয় বাড়লেও সেই তুলনায় তারা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না। বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণের কারণে উৎপাদনের প্রকৃত সুফল তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না।
অন্যদিকে রপ্তানিকারকদের দাবি, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পান আরও বড় পরিসরে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। বর্তমানে নানা প্রতিবন্ধকতা ও কথিত সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিতভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে না। সরাসরি রপ্তানির সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পানের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পান রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। উৎপাদন থেকে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কৃষক ও রপ্তানিকারক উভয়েই লাভবান হবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ার সুযোগ কাজে লাগাতে হলে মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, মানসম্মত প্যাকেজিং, পরিবহন সুবিধা এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় পানচাষি ও রপ্তানিকারকদের দাবি, কথিত সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ রপ্তানিকারকদের সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসার সুযোগ, রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।
তাদের প্রত্যাশা, সরকারের কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগে পান রপ্তানি খাত থেকে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের প্রভাব কমবে। এতে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন, রপ্তানিকারকদের ব্যবসার পরিধি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পানের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।
চাষির ঘামে উৎপাদিত পান যদি ন্যায্য দামে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারে, তাহলে লাভবান হবে শুধু কৃষক নয়, বাড়বে দেশের রপ্তানি আয়ও। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও সিন্ডিকেটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
