নেত্রকোনার-৫ আসনে সবক’টিতেই বিজয় নিশ্চিত চায় বিএনপি, একটিতে জামায়াতের অবস্থান ভালো



নেত্রকোণা থেকে ফিরে মোঃ লুৎফর রহমান (খাজা শাহ্) :

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলায় মূলত বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা থাকলেও লড়াইতে চমক দেখাতে পারে জাতীয় পার্টিও। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে, নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলায় জমে উঠেছে নির্বাচনী উত্তাপ আর ভোটের হাওয়া। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সরগরম তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ভোট দিতে না পারা ভোটারদের মাঝে শুরু হয়ে গেছে প্রার্থীদের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিগত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা বারবার নির্বাচিত হলেও, অদ্যাবধি জামায়াতে ইসলামীর কোন প্রার্থী জেলার কোন আসনে একবারও নির্বাচিত হতে পারেনি। এ অবস্থায় নেত্রকোনা জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। আর জামায়াতে ইসলামী চায় অন্তত একটি আসন ছিনিয়ে নিতে। একটি আসনে বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃৃত বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এ আসনে নির্বাচনী উত্তাপের পাশাপাশি ব্যাপক সহিংসতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

নেত্রকোনা-১ : জেলার কলমাকান্দা উপজেলা ও দুর্গাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-১ আসনটি। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৫৬ হাজার ১৮২ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৩১ হাজার ৭৫১ জন পুরুষ, দুই লাখ ২৪ হাজার ৪২৭ জন নারী ও চারজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-১ আসনে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে সিরাজুল ইসলাম, ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র হিসেবে সিরাজুল ইসলাম, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে আব্দুল করিম আব্বাসী, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জালাল উদ্দিন তালুকদার, ২০০১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে আব্দুল করিম আব্বাসী ও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মোশতাক আহমেদ রুহী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।

গারো হাজং ও বাঙ্গালী অধ্যুষিত ভারতীয় সীমান্তবর্তী এই আসনটিতে এবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিষ্টার কায়সার কামাল। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের খেলাফত মজলিশের প্রার্থী (সাবেক এমপি জাতীয় পার্টি) গোলাম রব্বানী। এ আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হচ্ছেন, জাতীয় পার্টির মো. আনোয়ার হোসেন খান, বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির মো. আলকাছ উদ্দিন মীর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আব্দুল মান্নান সোহাগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এর মো. বেলাল হোসেন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিষ্টার কায়সার কামালের বিজয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী বলে সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

নেত্রকোনা-২ : জেলার সদর ও বারহাট্টা উপজেলা নিয়ে নেত্রকোনা-২ আসন গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ দুই হাজার ৪৩৮ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৫২ হাজার ৩৭৯ জন পুরুষ, দুই লাখ ৫০ হাজার ৪৭ জন নারী ও ১২ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

পূর্ববর্তী ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এই আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জালাল উদ্দিন তালুকদার, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে আবু আব্বাস, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে ফজলুর রহমান খান, ২০০১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে আবদুল মোমিন, ২০০৪ সালে উপ-নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে আবু আব্বাস ও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে আশরাফ আলী খান খসরু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ছিলেন।

এবার আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন, জেলা বিএনপির সভাপতি বিশিষ্ট অর্থোপেডিক্স চিকিৎসক প্রফেসর ডা. মো. আনোয়ারুল হক। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমান খান পাঠান। এ আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হচ্ছেন, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম, জাতীয় পার্টির এ বি এম রফিকুল হক তালুকদার ও খেলাফত আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব গাজী আব্দুর রহীম রুহী। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি প্রফেসর ডা. মো. আনোয়ারুল হকের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

নেত্রকোনা-৩ : জেলার কেন্দুয়া ও আটপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৩ আসন। এ আসনের মোট ভোটার চার লাখ ২০ হাজার ৬৮৬ জন। এরমধ্য দুই লাখ ১৪ হাজার ৮৮৩ জন পুরুষ, দুই লাখ পাঁচ হাজার ৭৯৪ জন নারী ও নয়জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

এই আসনে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে ফজলুর রহমান খান, ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র থেকে আশরাফ উদ্দিন খান, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জুবেদ আলী, ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে নুরুল আমিন তালুকদার, ২০০১ সালে একই দলের নুরুল আমিন তালুকদার ও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মনজুর কাদের কোরাইশী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ছিলেন।

এবারের নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ড. মো. রফিকুল ইসলাম হিলালী। তার সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, কেন্দুয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র, কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল। এ আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হচ্ছেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. খায়রুল কবীর নিয়োগী, জাতীয় পার্টির মো. আবুল হোসেন তালুকদার, ইসলামী আন্দোলনের মো. জাকির হোসেন ও ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থী মো. শামছুজ্জোহা।

এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সাথে বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলালের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত কার মুখে বিজয়ের হাসি ফুটবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত।

নেত্রকোনা-৪ : জেলার হাওরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৪ আসন। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ২৮ হাজার ৮০৪ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ২১ হাজার ১১৪ জন পুরুষ, দুই লাখ সাত হাজার ৬৮৭ জন নারী ও তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

পূর্ববর্তী ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জুবেদ আলী, ১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র লুৎফুজ্জামান বাবর, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে আবদুল মোমিন, ২০০১ সালে বিএনপি থেকে লুৎফুজ্জামান বাবর ও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে রেবেকা মমিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ছিলেন।

এ আসনটি বিএনপি তথা বাবর এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এবারও বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন, হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আল হেলাল তালুকদার। এ আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হচ্ছেন, ইসলামী আন্দোলনের মো. মুখলেছুর রহমান, বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির জলি তালুকদার ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির চম্পা রানী সরকার। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সবচেয়ে বেশী ভোট পেয়ে নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

নেত্রকোনা-৫ : জেলার পূর্বধলা উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৫ আসন। এ আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৯০ হাজার ১১৭ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৬ জন পুরুষ, এক লাখ ৪২ হাজার ২১৯ জন নারী ও দুইজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

পূর্ববর্তী ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এই আসনে জাতীয় পার্টি থেকে দেওয়ান শাহজাহান ইয়ার চৌধুরী, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ও ২০১৮ সালেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ছিলেন।

এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক ভিপি মো. আবু তাহের তালুকদার। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর এ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারী ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর মাছুম মোস্তফা। এছাড়া আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের মো. নুরুল ইসলাম নির্বাচন করছেন।

এ আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের অভিমত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন