একমন ধানের দামে মিলছে না একজন শ্রমিক : আধুনিক পদ্ধতির দাবি

 


  • নওয়াপাড়ায় মানুষ কেনা-বেচার হাট জমজমাট

মফিজুর রহমান, অভয়নগর (যশোর) : যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া অঞ্চলে কৃষি মৌসুম এলেই যে দৃশ্যটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো শ্রমিকের হাট। স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হয় “মানুষের হাট”। সকালের সূর্য ওঠার আগেই ভৈরব নদীর পাড়, রেলষ্টেশন সংলগ্ন এলাকা কিংবা বিভিন্ন মোড়ে জমে ওঠে এই অস্থায়ী শ্রমবাজার। কিন্তু এবারের মৌসুমে সেই চিরচেনা দৃশ্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। শ্রমিক সংকট, বাড়তি মজুরি, আর দিশেহারা কৃষক। এদিকে উপজেলায় ৪টি হারভেস্টার মেশিন থাকলেও কার্যত কোনটিই নেই ধান কাটার কাজে।

স্থানীয় গৃহস্থদের অভিযোগ, বর্তমানে ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া যেন সোনার হরিণ। এক সময় যেখানে ভোরে দাঁড়িয়ে দরদাম করে সহজেই শ্রমিক পাওয়া যেত, এখন সেখানে শ্রমিকরা নিজেরাই মজুরি নির্ধারণ করছেন। কৃষকদের ভাষ্য, “একমন ধানের দাম দিয়েও একজন শ্রমিক মিলছে না।” ফলে ধান পেকে মাঠে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

নওয়াপাড়ার কৃষক আব্দুল গফুর বলেন, “আগে সকালে হাটে গেলে ১০-১২ জন শ্রমিক নিয়ে মাঠে যেতে পারতাম। এখন ৪-৫ জনও পাওয়া যায় না। যারা আসে, তারা দিনে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা দাবি করে। খাওয়া-দাওয়া আলাদা। এই খরচ দিয়ে চাষ করে লাভ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

শুধু গফুরই নন, একই অভিযোগ করেছেন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা। তাদের মতে, বর্তমান ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মন ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এদিকে বাজারদর কম থাকলেও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে লাভের বদলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

অন্যদিকে শ্রমিকদের বক্তব্যও একেবারে ভিন্ন। তারা বলছেন, বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে কম মজুরিতে কাজ করা সম্ভব নয়। দিনমজুর রহিম শেখ বলেন, “চাল, ডাল, তেলÍসবকিছুর দাম বেড়েছে। আমরা যদি ৮০০-১০০০ টাকা না পাই, তাহলে পরিবার চালাবো কীভাবে? সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে কাজ করা সহজ না।”

তবে স্থানীয়দের দাবি, শ্রমিক সংকটের পেছনে শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, আরও কিছু কারণ রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কৃষিকাজে অনীহা, শহরমুখী হওয়া, এবং বিকল্প পেশায় ঝুঁকে পড়া এই সংকটকে তীব্র করেছে। অনেকেই ইটভাটা, গার্মেন্টস কিংবা শহরের বিভিন্ন কাজের দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে তুলনামূলক স্থায়ী আয় পাওয়া যায়।

এছাড়া কিছু কৃষকের মতে, বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যাও বেড়েছে, যার ফলে স্থানীয়ভাবে শ্রমশক্তি কমে যাচ্ছে। ফলে মৌসুমভিত্তিক কাজের সময় শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ছোট ও মাঝারি কৃষকরা। বড় কৃষকেরা কোনোভাবে বেশি টাকা দিয়ে শ্রমিক জোগাড় করতে পারলেও ছোট কৃষকদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, ধান পেকে গেলেও সময়মতো কাটতে না পারায় ঝড়ে বা বৃষ্টিতে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।

নওয়াপাড়ার আরেক কৃষক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, “ধান পেকে গেছে, কিন্তু কাটার লোক নাই। দেরি হলে বৃষ্টি আসলে সব শেষ। এখন কী করবো বুঝতে পারছি না।”

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কৃষকদের একাংশ আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা বলছেন, এখন সময় এসেছে হাতে কাস্তে নিয়ে ধান কাটার প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে মেশিননির্ভর পদ্ধতিতে যাওয়ার।

এব্যাপারে অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা লাভলী খাতুন জানান, উপজেলায় ৪টি হারভেষ্টার মেশিন থাকলেও একটি হাওড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্য একটি সার্ভিসিং করানো হচ্ছে। আর বাকি দুইটি কিস্তি বাকি থাকায় কোম্পানী আটকে রেখেছে। তবে বিষয়টি গুর”ত্ব সহকারে দেখছেন। তাদের মতে, হারভেস্টার মেশিন বা কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করলে খুব অল্প সময়ে কম খরচে ধান কাটা সম্ভব। এতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন।

তবে বাস্তবতা হলো, এসব আধুনিক যন্ত্রপাতির দাম অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণ কৃষকের পক্ষে তা কেনা সম্ভব হয় না। ফলে তারা সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকির দাবি জানিয়েছেন। অনেকেই বলেছেন, যদি ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মেশিন ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে এই সংকট অনেকটাই কমে আসবে।

একজন কৃষক নেতা বলেন, “আমাদের এখানে যদি সরকারিভাবে হারভেস্টার মেশিন দেওয়া হয় বা সহজ শর্তে ভাড়া পাওয়া যায়, তাহলে শ্রমিক সংকট বড় সমস্যা হবে না। এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে কৃষিকাজ আরও কঠিন হয়ে যাবে।”

এদিকে স্থানীয় বাজারে শ্রমিকের হাট এখনো জমজমাট থাকলেও সেটি যেন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকরা নিজেদের সুবিধামতো কাজ বেছে নিচ্ছেন, আর কৃষকেরা অসহায়ভাবে অপেক্ষা করছেন।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কৃষিকে টেকসই রাখতে হলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি বৃদ্ধি, এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।

অভয়নগ বর্তমান বাস্তবতা যেন দেশের সার্বিক কৃষি ব্যবস্থার একটি প্রতিচ্ছবি, যেখানে একদিকে শ্রমিকের অভাব, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের চাপ। এই দুইয়ের মাঝে পড়ে কৃষকরা ক্রমেই দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। অতএব, সময়ের দাবি এখন একটাই, ধান কাটার আধুনিক পদ্ধতির দ্রুত সম্প্রসারণ। নইলে “মানুষের হাট” যতই জমজমাট হোক না কেন, কৃষকের মুখে হাসি ফিরবে না, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন