মুন্সীগঞ্জে ইউএনওর বিদায়ে এতিম শিশুদের কান্না, শিশু পরিবারে ইফতার মাহফিল



শ্রীনগর মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিনের বদলির খবরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছে উপজেলার ভাগ্যকুলে অবস্থিত জেলার একমাত্র সরকারি শিশু পরিবার (বালক)-এর এতিম শিশুরা। বিদায়ের আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি এতিম শিশুদের সঙ্গে ইফতার মাহফিলে অংশ নেন। এ সময় অনেক শিশুই কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং প্রিয় এই কর্মকর্তার বিদায়ে গভীর কষ্ট প্রকাশ করে।

ইফতারের সময় শিশুদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র নয়ন আবেগঘন কণ্ঠে বলে, আমাদের তো বাবা-মা নেই। ইউএনও স্যার এসে আমাদের বাবা-মায়ের পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন আমাদের সঙ্গে ঈদ করবেন। কিন্তু গতকাল শুনলাম স্যারের বদলি হয়েছে। আমাদের আর স্যারের সঙ্গে ঈদ করা হলো না। স্যার আমাদের বাবা-মায়ের অভাবটা অনেকটা দূর করেছিলেন।

সরকারি শিশু পরিবারের একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, ইউএনও মহিন উদ্দিন শুধু সুযোগ-সুবিধা বাড়াননি, শিশুদের খাদ্য ও পুষ্টির বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রতিদিন শিশুদের জন্য ডিম ও দুধের ব্যবস্থা করেন এবং পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেন। শিক্ষার্থীটি বলেন, আমি এখানে সাত বছর ধরে আছি। এতদিনে উনার মতো একজন স্যার দেখিনি। উনি মাসে অন্তত একবার আমাদের দেখতে আসতেন এবং বলতেন ওরা আমার ছেলে। তখন মনে হতো আমাদেরও একজন অভিভাবক আছে।

নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী জানায়, গত পাঁচ বছরে অনেক কর্মকর্তা দেখলেও মহিন উদ্দিনের মতো কাউকে পায়নি তারা। তিনি শিশুদের আনন্দের জন্য ‘হাসিখুশি চত্বর’ নামে একটি পার্ক নির্মাণ করেন এবং বিভিন্ন ফলজ গাছ রোপণ করেন।

দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, গত বছর আমরা স্যারের সঙ্গে ঈদ করেছি। এ বছরও তার সঙ্গে ঈদ করার ইচ্ছে ছিল। আজকে হয়তো তার সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। কথায় প্রকাশ করতে পারছি না কতটা কষ্ট লাগছে।

ইউএনও মো. মহিন উদ্দিন বলেন, শ্রীনগরে যোগদানের পর থেকেই তিনি শিশু পরিবারটির বাচ্চাদের প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। তিনি জানান, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন প্রতিজনকে একটি করে ডিম দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যা প্রায় ১৮ মাস ধরে চলমান রয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন দুধ সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। শিশুদের মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতা বাড়াতে নাচ-গানের শিক্ষক নিয়োগ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ক্রীড়া সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।

তার উদ্যোগে শিশু পরিবারে ‘প্রযুক্তির প্রাঙ্গণ’ নামে একটি কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয় এবং ছোটদের জন্য ‘হাসিখুশি চত্বর’ নির্মাণ করা হয়। এছাড়া কৃষি বিভাগের সহায়তায় সবজি চাষ, বিভিন্ন ফলজ বৃক্ষ রোপণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদে পোশাক প্রদান, ধর্মীয় শিক্ষার জন্য কোরআনের হাফেজ নিয়োগসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এছাড়া কোরবানির গরু, ইলিশ মাছ, দুম্বার মাংস সরবরাহ, ক্রীড়া সামগ্রী প্রদান এবং ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় শিশুদের জন্য নিয়মিত দুধের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) গোলাম রাব্বানী সোহেল, শ্রীনগর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, শ্রীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুয়েল মিয়া, শ্রীনগর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার দেওয়ানা আজাদ হোসেনসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।

বিদায়ের মুহূর্তে এতিম শিশুদের ভালোবাসা ও আবেগে আপ্লুত হয়ে ইউএনও মহিন উদ্দিন তাদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। জীবনে বড় মানুষ হবে। আমি সবসময় তোমাদের জন্য দোয়া করি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন